শ্রীভুমি জেলার বৃহত্তর শনবিলের পূর্বাঅঞ্চলে ২৪ ঘণ্টায় দুই ঘণ্টাও নেই সিগন্যাল, ডিজিটাল লেনদেন বন্ধ, ক্ষোভে ফুঁসছে কালীবাড়ি-গামারিয়া-নবীনগ্রাম অঞ্চলের মানুষ

বিগত কয়েকদিন ধরে শনবিল উপকূলীয় অঞ্চলের কালীবাড়ি, গামারিয়া, নবীন গ্রাম, পূর্ব নবীন এবং খলাগ্রাম সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিষেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঠিকমতো দুই ঘণ্টাও নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না। কখনও পুরোপুরি সিগন্যাল উধাও, আবার কখনও কল ড্রপ বা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যায় নাজেহাল হতে হচ্ছে মানুষকে। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা সব ক্ষেত্রেই সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মক অচলাবস্থা।

উক্ত এলাকায় বর্তমানে প্রধানত দুটি মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিষেবা জিও ও বিএসএনএল চালু রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে গ্রাহকরা তার কোনো সুফল পাচ্ছেন না বলেই অভিযোগ। নেটওয়ার্কের সিগন্যাল কখনও সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যাচ্ছে, আবার কখনও কল সংযোগ পেলেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কেটে যাচ্ছে। ইন্টারনেট পরিষেবাও অধিকাংশ সময় সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ছে। এলাকাবাসীর বক্তব্য, নেটওয়ার্ক থাকলেও যেন নেই। ফোন করা যায় না, ইন্টারনেট চলে না। জরুরি সময়ে যোগাযোগ করারও উপায় থাকে না। এই অবস্থায় আমরা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি।

বর্তমান সময়ে বাজার-ব্যবস্থার একটি বড় অংশই নির্ভর করছে ডিজিটাল লেনদেনের উপর। কিন্তু নেটওয়ার্ক বিপর্যয়ের কারণে শনবিল পূর্বাঞ্চলের বাজারগুলোতে এখন কার্যত স্থবিরতা নেমে এসেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনলাইন পেমেন্ট বা ইউপিআই লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষই সমস্যায় পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে নগদ অর্থের অভাবে কেনাবেচা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একজন ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আজকের দিনে বেশিরভাগ গ্রাহকই ডিজিটাল পেমেন্ট করেন। কিন্তু নেটওয়ার্ক না থাকায় টাকা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে আমাদের ব্যবসায় মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

মোবাইল নেটওয়ার্কের এই বিপর্যয় শুধু ব্যবসা বা ব্যক্তিগত যোগাযোগেই সীমাবদ্ধ নেই, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চিকিৎসা পরিষেবাতেও। অনেক রোগী এখন অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা টেলিমেডিসিন পরিষেবার উপর নির্ভর করেন। কিন্তু নেটওয়ার্ক না থাকায় সেই সমস্ত পরিষেবাও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। জরুরি অবস্থায় ডাক্তার বা অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করাও অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও আতঙ্ক আরও বেড়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা, ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বহু কাজই অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। কিন্তু নেটওয়ার্ক না থাকায় ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনলাইন আবেদন বা ব্যাংকিং লেনদেন সবই মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একজন ছাত্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, অনলাইন ফর্ম ফিল-আপ বা পড়াশোনার জন্য ইন্টারনেট দরকার। কিন্তু এখানে নেটওয়ার্কই নেই। ফলে আমরা পিছিয়ে পড়ছি।

এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই বড় প্রশ্ন উঠছে, দেশজুড়ে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যে স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে তার চিত্র কি এমনই? একদিকে যেখানে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ সামান্য মোবাইল নেটওয়ার্কের জন্য দিনের পর দিন দুর্ভোগে পড়ে থাকবেন এমন বৈপরীত্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। অনেকেই কটাক্ষ করে বলছেন, ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে ইন্ডিয়া কেবল শহরের জন্য, গ্রামের মানুষ যেন এখনও সেই পুরোনো যুগেই পড়ে আছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চললেও এখনও পর্যন্ত জনপ্রতিনিধি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে এলাকাবাসীর মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, সমস্যাটি বহুবার সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও নেটওয়ার্ক কোম্পানিগুলির নজরে আনা হলেও এখনও পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমাধান করা হয়নি।

এলাকাবাসী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, অতিসত্বর এই নেটওয়ার্ক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। অন্যথায় জিও ও বিএসএনএল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন তারা। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট টেলিকম সংস্থাগুলিকে অবিলম্বে প্রযুক্তিগত ত্রুটি খতিয়ে দেখে অতিরিক্ত টাওয়ার স্থাপন বা নেটওয়ার্ক পরিকাঠামো উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনের তরফেও দ্রুত হস্তক্ষেপ করা জরুরি বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। এখন দেখার বিষয়, শনবিল পূর্বাঞ্চলের হাজারো মানুষের এই তীব্র ক্ষোভ ও আর্তনাদ কত দ্রুত পৌঁছায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কানে, এবং আদৌ এর কোনো কার্যকর সমাধান হয় কি না। কারণ আধুনিক ভারতের উন্নয়নের গল্প তখনই সত্যি হবে, যখন দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও সমানভাবে প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করতে পারবেন শুধু ঘোষণায় নয়, বাস্তবেও।

Related Posts

কাটাখাল নদীর করাল গ্রাসে সিংহপুর, ভাঙনে তলিয়ে যাচ্ছে শতাধিক বাড়ি

বরাকবাণী দৈনিক ডিজিটাল ডেস্ক, ১১ মার্চঃ হাইলাকান্দি জেলার ১১৬ নম্বর বিধানসভা এলাকার কালিনগর চতুর্থ খণ্ডের কাটাখাল সিংহপুর গ্রামে আবারও নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বরাক নদীর ভয়াবহ ভাঙন। প্রকৃতির এই…

শ্রীভূমি জেলার মালুয়ায় বেপরোয়া ডাম্পারের চাকায় পিষ্ট স্কুটি আরোহী নিহত

বরাকবাণী দৈনিক ডিজিটাল ডেস্ক, ১১ মার্চঃ শ্রীভূমি জেলার মালুয়া জলালপুর এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন এক স্কুটি আরোহী। বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসা একটি ডাম্পারের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়…