হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা: আটকে ৩৬ ভারতীয় জাহাজ, নিরাপদে সরাতে বিকল্প খুঁজছে দিল্লি

ভারতের ডিরেক্টোরেট জেনারেল অফ শিপিং-এর ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল (ক্রু) পিসি মীনা জানিয়েছেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালী এবং সংলগ্ন জলসীমায় প্রায় ৩৬টি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ অবস্থান করছে। এই জাহাজগুলিকে নিরাপদে ওই অঞ্চল থেকে বের করে আনার জন্য বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠায় কেন্দ্রীয় সরকারও বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

মীনার কথায়, ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। সেই কারণে হরমুজ প্রণালী ছাড়াও ওমান উপসাগর, পারস্য উপসাগর এবং তৎসংলগ্ন সমুদ্র অঞ্চলে চলাচলকারী সমস্ত ভারতীয় জাহাজকে কঠোর সুরক্ষা প্রোটোকল মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে জাহাজগুলিকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকাও অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী থেকে ভারতীয় জাহাজগুলিকে নিরাপদে সরিয়ে আনার জন্য নৌবাহিনীর এসকর্ট ব্যবস্থার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে। সূত্রের খবর, প্রয়োজনে ভারতীয় নৌবাহিনীকে ব্যবহার করে ওই অঞ্চলে থাকা জাহাজগুলিকে নিরাপদে বের করে আনার পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা চলছে।

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হল হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে যুক্ত করেছে এই সরু জলপথ। ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত ও ইরাকের মতো বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলি তাদের তেল রফতানির জন্য এই পথের উপরই ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

এই প্রণালীর সংকীর্ণতম অংশের প্রস্থ মাত্র প্রায় ৩৩ কিলোমিটার। ফলে সামান্য সামরিক উত্তেজনাতেই এই গুরুত্বপূর্ণ রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। তাই হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা মানেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা।

ভারতের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের মোট অপরিশোধিত তেলের আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই আসে এই রুট দিয়ে। ফলে হরমুজ প্রণালীতে সামান্য বিঘ্নও ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীতে কয়েকশো তেলের ট্যাঙ্কার ও বাণিজ্যিক জাহাজ কার্যত আটকে পড়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলিও পরিস্থিতির দিকে গভীর উদ্বেগ নিয়ে নজর রাখছে। কারণ এই রুট প্রায় বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বের বহু দেশে তেলের সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ বিকল্প সমুদ্রপথ বা সরবরাহ ব্যবস্থা খুঁজে দেখার চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবে হরমুজ প্রণালীর বিকল্প খুঁজে পাওয়া সহজ নয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘর্ষ তীব্র হওয়ার পর ইরান ইতিমধ্যেই একাধিক ট্যাঙ্কারের উপর হামলা চালিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

জানা গিয়েছে, অন্তত ৯টি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেগুলিতে ভারতীয় নাবিকও ছিলেন। এই হামলাগুলিতে ইতিমধ্যেই কয়েকজন ভারতীয় নাবিকের প্রাণহানির ঘটনাও সামনে এসেছে।

১ মার্চ ওমানের খসব বন্দরের কাছে এমটি স্কাইলাইট নামের একটি তেলের ট্যাঙ্কারে হামলায় প্রাণ হারান ক্যাপ্টেন আশিস কুমার এবং অয়লার পদে থাকা দিলীপ সিং। এছাড়া ওমানের মাস্কাট থেকে প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল দূরে থাকা এমকেডি ব্যোম নামের আরেকটি ট্যাঙ্কারে হামলার ঘটনায় নিহত হন অয়লার দিক্ষীত অমৃতলাল সোলাঙ্কি। এই ঘটনাগুলি ভারতীয় নৌপরিবহন মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এক নতুন প্রস্তাব দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মহলে খবর ছড়িয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের তরফে নাকি মিত্র দেশগুলিকে জানানো হয়েছে, নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের দেশের জাহাজগুলিকে হরমুজ প্রণালী পার করাতে নিরাপত্তা এসকর্ট দিতে পারে।

তবে এই প্রস্তাবকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন। সমালোচকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক সুযোগের সন্ধান করছে। যদিও এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি।

এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই ভারত সরকার আপাতত নিজের কৌশলেই সমস্যার সমাধান খুঁজতে চাইছে। সূত্রের খবর, দিল্লি চাইছে ভারতীয় জাহাজগুলিকে যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ জলসীমায় নিয়ে আসতে। সেই লক্ষ্যেই নৌবাহিনী, শিপিং মন্ত্রক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মধ্যে সমন্বয় রেখে পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নয়, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনা এখন কেবল একটি সামরিক সংঘাতের বিষয় নয়; তা ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। আর সেই অস্থিরতার মধ্যেই নিজেদের জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ভারত।

Related Posts

বিশ্বে অস্ত্র আমদানিতে দ্বিতীয় স্থানে ভারত: ইউক্রেনের পরেই দিল্লি

ওয়েবডেস্ক, বারাকবাণী, ৯ মার্চঃ বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার আবহে ক্রমেই বাড়ছে অস্ত্রের চাহিদা। ইউরোপে ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত এবং মধ্য এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে সামরিক শক্তি বাড়াতে মরিয়া…