স্টকহোমভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) সম্প্রতি ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের অস্ত্র আমদানির পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিশ্বের মোট অস্ত্র আমদানির ৯.৭ শতাংশ একাই করেছে ইউক্রেন। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা প্রয়োজনীয়তা বিপুল পরিমাণে বেড়ে যাওয়ায় এই আমদানির পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট অস্ত্র আমদানির ৮.২ শতাংশ করেছে ভারত। যদিও আগের পাঁচ বছরের তুলনায় ভারতের অস্ত্র আমদানির পরিমাণ সামান্য কমেছে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ভারতের অস্ত্র আমদানির পরিমাণ ছিল বিশ্বের মোট আমদানির ৯.৩ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন পরিসংখ্যানে ভারতের অস্ত্র আমদানিতে প্রায় ৪ শতাংশ হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হ্রাসের অন্যতম কারণ হল ভারত সরকারের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে স্বনির্ভর হওয়ার প্রচেষ্টা। দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারত বহু ক্ষেত্রে নিজস্ব অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছে। তবুও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে বিদেশি অস্ত্র আমদানির প্রয়োজন এখনও উল্লেখযোগ্য।

এসআইপিআরআই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের অস্ত্র আমদানির সবচেয়ে বড় অংশ আসে রাশিয়া থেকে। গত পাঁচ বছরে ভারতের মোট অস্ত্র আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই এসেছে রাশিয়া থেকে। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অত্যন্ত গভীর। যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সাবমেরিনসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি রাশিয়া থেকে সংগ্রহ করে থাকে ভারত।

রাশিয়ার পরে ভারতের অস্ত্র আমদানির দ্বিতীয় বড় উৎস ফ্রান্স। ভারতের মোট আমদানির প্রায় ২৮ শতাংশ অস্ত্র এসেছে ফ্রান্স থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে ফরাসি নির্মিত রাফাল যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ভারতের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এরপরেই রয়েছে ইজরায়েল, যেখান থেকে ভারত প্রায় ১৫ শতাংশ অস্ত্র আমদানি করেছে। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি, নজরদারি ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইজরায়েল ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানির চিত্রও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। সামগ্রিক আমদানির হিসাবে পাকিস্তান ভারতের অনেক পিছনে থাকলেও গত কয়েক বছরে তাদের অস্ত্র আমদানির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৬-২০২০ সময়কালের তুলনায় ২০২১-২০২৫ সময়কালে পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানি প্রায় ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানির প্রধান উৎস হল চিন। গত পাঁচ বছরে পাকিস্তানের মোট অস্ত্র আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই এসেছে চিন থেকে। এছাড়া তুরস্ক থেকেও তারা প্রায় ৭ শতাংশ অস্ত্র আমদানি করেছে। এর আগে ২০১৬ থেকে ২০২০ সময়কালে পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানির প্রায় ৭৩ শতাংশই ছিল চিননির্ভর।

বিশ্বের বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশগুলির তালিকায় ভারতের পরে তৃতীয় স্থানে রয়েছে সৌদি আরব এবং চতুর্থ স্থানে কাতার। পাকিস্তান রয়েছে পঞ্চম স্থানে। এই তালিকায় চিন রয়েছে ২১তম স্থানে, যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছে। কারণ চিন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তি হলেও তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ওপর অধিক নির্ভরশীল।

চিনের অস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের মোট আমদানির প্রায় ৬৬ শতাংশই আসে রাশিয়া থেকে। এছাড়া ইউক্রেন এবং ফ্রান্স থেকেও যথাক্রমে ১৫ ও ১৩ শতাংশ অস্ত্র সংগ্রহ করে থাকে বেইজিং।

রাশিয়ার অস্ত্র রফতানির ক্ষেত্রেও ভারতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এসআইপিআরআই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, রাশিয়ার মোট অস্ত্র রফতানির প্রায় ৪৮ শতাংশই যায় ভারতের কাছে। অর্থাৎ রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা এখনও ভারত। এর পরে চিন ও বেলারুশের কাছে তারা প্রায় ১৩ শতাংশ অস্ত্র রফতানি করে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একটি ভিন্ন ছবি দেখা গেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকা এখনও কিছু অস্ত্র বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকার মোট অস্ত্র আমদানির প্রায় ১৭ শতাংশ আসে ব্রিটেন থেকে এবং প্রায় ১৪ শতাংশ আসে ফ্রান্স থেকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি প্রায় সব দেশের কাছেই কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করছে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের অস্ত্র আমদানির অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং প্রতিরক্ষা নীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। একদিকে ভারত দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশলগত সক্ষমতা অর্জনের জন্য বিদেশি অস্ত্র আমদানিও চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির এই অস্থির সময়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি বাস্তবতা নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা শক্তি এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠেছে। আর সেই প্রতিযোগিতার ময়দানেই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের প্রায় সব দেশ।