বরাকবাণী ডিজিটাল ১৭ এপ্রিলঃ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ফের শিরোনামে উঠে এলেন সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময়কৃষ্ণ দাস। একাধিক গুরুতর অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে জেলবন্দি থাকা এই বিতর্কিত ব্যক্তিত্বকে নিয়ে নতুন মোড় নিল আইনি লড়াই। চট্টগ্রামের একটি মামলায় অবশেষে জামিন মঞ্জুর হলেও, আপাতত মুক্তির আলো দেখছেন না তিনি কারণ, তাঁর বিরুদ্ধে এখনও ঝুলছে একাধিক গুরুতর মামলা।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের আদালতে বিচারক শাখাওয়াত হোসেন চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের জামিন মঞ্জুর করেন। মামলাটি ছিল চট্টগ্রামের হাটহাজারি অঞ্চলে জমিদখল, ভীতিপ্রদর্শন এবং মারধরের অভিযোগ ঘিরে, যা ২০২৩ সালে দায়ের করা হয়। এই মামলায় চিন্ময়কৃষ্ণ-সহ মোট ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। গত ৭ এপ্রিল তাঁকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর হয়েছিল আদালতে, এবং সেই প্রেক্ষিতেই তাঁর জামিনের আবেদন ওঠে শুনানিতে।
তবে এই জামিন তাঁর জন্য আপাতত স্বস্তি বয়ে আনতে পারেনি। কারণ, আইনজীবী সাইফুল ইসলামকে হত্যা-সহ আরও অন্তত ছয়টি মামলায় তিনি অভিযুক্ত। ফলে আইনি জটিলতার জালে আটকে থেকে তাঁকে আপাতত জেলেই থাকতে হচ্ছে।
চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ এবং বহুমাত্রিক। জমি দখল ও ভয় দেখানোর অভিযোগের পাশাপাশি, তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে দেশদ্রোহের মামলাও দায়ের হয়েছে। এছাড়া পুলিশের উপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা, আইনজীবী ও বিচারপতিদের উপর আক্রমণ এই সব ঘটনাতেও তাঁর নাম জড়িয়েছে। এমনকি ককটেল বিস্ফোরণের মতো গুরুতর অপরাধের মামলাও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি ঘিরে রয়েছে আইনজীবী সাইফুল ইসলামের নৃশংস হত্যাকাণ্ড। অভিযোগ, চিন্ময়কৃষ্ণের জামিনকে কেন্দ্র করে যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, তার জেরে সাইফুলকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে খুন করা হয়। সাইফুলের বাবা জামালউদ্দিন এই ঘটনায় ৩১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন, যেখানে চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের নামও উল্লেখ করা হয়। পুলিশের দাবি, চিন্ময়কৃষ্ণের উস্কানিতেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার পর লাঠি ও ইঁট দিয়েও সাইফুলকে মারধর করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ইতিমধ্যেই কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। চন্দন দাস, রিপন দাস ও রাজীব ভট্টাচার্য নামে তিন অভিযুক্ত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক বয়ান দিয়েছেন বলে সূত্রের খবর, যা মামলার গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। চিন্ময়কৃষ্ণ দাস একসময় আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সংগঠন ইসকন-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে একের পর এক বিতর্কের জেরে তাঁর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে সংগঠনটি। ইসকনের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, চিন্ময়কৃষ্ণের ব্যক্তিগত বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই।
চিন্ময়কৃষ্ণের গ্রেফতার ও দীর্ঘদিন ধরে জামিন না পাওয়াকে কেন্দ্র করে ভারতেও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তাঁর আইনজীবী রবীন্দ্র ঘোষ ভারতের হস্তক্ষেপ চেয়ে নরেন্দ্র মোদি এবং এস জয়শঙ্কর-এর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি আবেদন জানান, কূটনৈতিক স্তরে বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা হোক।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলেও এই ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। বিজেপি নেতৃত্বের পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা কুণাল ঘোষ-এর সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাৎ হয় বলে জানা যায়। এই ঘটনা সীমান্ত পেরিয়ে রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের বিদেশমন্ত্রকও চিন্ময়কৃষ্ণের গ্রেফতার ও জামিন প্রত্যাখ্যানের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, আইনের শাসন বজায় রাখা এবং ন্যায়বিচারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা নয়, বরং বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ধর্মীয় সংবেদনশীলতার জটিল এক প্রতিচ্ছবি তুলে ধরছে। একদিকে আদালতের জামিনের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে একাধিক গুরুতর মামলার জেরে কারাবাস, এই দ্বৈত বাস্তবতা চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। সব মিলিয়ে, জামিন মঞ্জুর হলেও মুক্তি এখনও দূরের এই পরিস্থিতি ঘিরে আগামী দিনে আইনি ও রাজনৈতিক মহলে আরও উত্তেজনা বাড়তে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।


