বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১৪ মেঃ দেশজুড়ে খুব শীঘ্রই পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের ক্রমবর্ধমান দামের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভারতের অর্থনীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির পর এবার ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর সঞ্জয় মলহোত্রা ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘদিন উচ্চস্তরে থাকলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের জ্বালানি বাজারে। কারণ ভারত এখনও তার চাহিদার বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা খনিজ তেলের ওপর নির্ভরশীল। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত যদি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে খারাপ প্রভাব পড়বে শুধু পেট্রোল বা ডিজেলের দামের উপর নয়, বরং পরিবহণ খরচ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য এবং সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতির ওপরও।
সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক আর্থিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আরবিআই গভর্নর সঞ্জয় মলহোত্রা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সময়ের দাবি হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে যদি অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকে, তাহলে দেশের অভ্যন্তরে খুচরো জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি প্রায় অনিবার্য হয়ে পড়বে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এর ফলে পরিবহণ ব্যয় বাড়বে এবং তার প্রভাব পড়বে খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে প্রতিটি পণ্যের দামের ওপর।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চাপে ভারত, মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত আরবিআই গভর্নর ও কেন্দ্রের
আরবিআই গভর্নর আরও জানান, যদি এই অর্থনৈতিক চাপ সাময়িক হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই এগোতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকবে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে ভবিষ্যতে সুদের হার বৃদ্ধি, ঋণের খরচ বাড়া কিংবা আরও কড়া আর্থিক নীতি গ্রহণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত এপ্রিল মাসে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রেপো রেট ৫.২৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে আগামী ৫ জুন অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মুদ্রানীতি বৈঠকের দিকে এখন গোটা দেশের আর্থিক মহলের নজর রয়েছে। কারণ সেই বৈঠকেই ভবিষ্যতের সুদের হার এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরবিআই কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলতে পারে।
অন্যদিকে, পরিস্থিতি নিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি। তিনি জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে পেট্রোল, ডিজেল এবং এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে প্রায় ৭৬ দিনের চাহিদা পূরণ করার মতো অপরিশোধিত তেলের ভাণ্ডার মজুত রয়েছে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে এলপিজি উৎপাদনও বাড়ানো হয়েছে।
পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়লে ফের বাড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম, এবার চাপ পড়তে পারে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে
তবে বাস্তব চিত্র কিন্তু উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতিমধ্যেই প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের উপরে অবস্থান করছে। অথচ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে দেশে এখনও জ্বালানির খুচরো দাম তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। এর ফলেই সরকারি তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সূত্রের খবর, বর্তমানে সরকারি তেল কোম্পানিগুলির দৈনিক লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, এই সংস্থাগুলির মোট ক্ষতির পরিমাণ ইতিমধ্যেই প্রায় ১.৯৮ লক্ষ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষতি বহন করা সরকারের পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থনৈতিক মহলের একাংশের মতে, তেল কোম্পানিগুলিকে টিকিয়ে রাখতে শেষ পর্যন্ত সরকারকে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতেই হতে পারে।
এই সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির খবর সামনে আসতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লেই তার প্রভাব পড়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই। বাসভাড়া, পণ্য পরিবহণ, কৃষিকাজ, বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য—সবকিছুর দাম বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলির ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে।
পরিবহণ ব্যবসায়ীদের একাংশের বক্তব্য, জ্বালানির দাম বাড়লে ট্রাক ও বাস পরিষেবার খরচ অনেক বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারদরে। অন্যদিকে গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কাতেও চিন্তিত সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক মহলেও এই ইস্যু নিয়ে চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামার অজুহাতে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে আর্থিক বোঝা চাপানো হতে পারে।
যদিও সরকার পক্ষের দাবি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি তেল সংস্থাগুলির বাড়তে থাকা লোকসান এই তিনের চাপে ভারতের জ্বালানি বাজার এখন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আগামী কয়েক সপ্তাহে কেন্দ্র সরকার ও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই এখন নজর গোটা দেশের।







