বরাক কি শুধু ভোটব্যাঙ্ক? দিসপুরের নতুন মন্ত্রিসভায় নেই উপত্যকার কোনো মুখ, ক্ষুব্ধ বাঙালি সমাজ

শুধু তাই নয়, গোটা অসম থেকেই একজন বাঙালিকেও মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হয়নি। আর এই ঘটনাই এখন ক্ষোভ, হতাশা ও আত্মসমালোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বরাকজুড়ে। বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, ভোটের সময় কি বরাক কেবল প্রয়োজনীয় ভোটব্যাঙ্ক, আর ক্ষমতার সময় অপ্রয়োজনীয় বোঝা? কারণ, গত বিধানসভা নির্বাচনে বরাকের মানুষ বিজেপিকে শুধু সমর্থনই করেননি, প্রায় নিঃশর্ত আস্থা উজাড় করে দিয়েছেন। ১০টি আসনের মধ্যে ৯টিতেই জয় এনে দিয়েছেন শাসকদলকে। বিশেষ করে হিন্দু বাঙালি ভোটারদের বিপুল সমর্থন ছাড়া এই সাফল্য কার্যত অসম্ভব ছিল। অথচ মন্ত্রিসভা গঠনের সময় দেখা গেল, সেই বরাকের জন্য দিসপুরের দরজা কার্যত বন্ধ।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বরাক উপত্যকাকে নতুন মন্ত্রিসভায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার ঘটনা নিছক কোনো দলীয় কৌশল নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক বার্তা। তাঁদের দাবি, ভোটের সময় বরাককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হলেও, ক্ষমতা ভাগাভাগির মুহূর্তে উপত্যকাকে আর প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বরাক কি শুধুই ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহৃত একটি নির্ভরযোগ্য ভোটব্যাঙ্ক, নাকি সত্যিই ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত? এই অসন্তোষ এখন আর শুধু বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরে সীমাবদ্ধ নেই।

বিজেপির অন্দরমহল থেকেও ধীরে ধীরে ক্ষোভের সুর ভেসে আসছে। তৃণমূল স্তরের বহু কর্মী ও সমর্থক নিজেদের মধ্যে খোলাখুলি আলোচনা শুরু করেছেন এই বঞ্চনা নিয়ে। তাঁদের একাংশের বক্তব্য, নির্বাচনের সময় দিনরাত পরিশ্রম করে দলের জন্য জনসমর্থন আদায় করা হলেও, শেষ পর্যন্ত বরাকের মানুষের রাজনৈতিক সম্মানের প্রশ্নে দল নীরব থেকেছে। কর্মী-সমর্থকদের অনেকেই আক্ষেপের সুরে বলছেন, আমরা ভোট এনে দিলাম, সরকার গঠনে বড় ভূমিকা নিলাম, অথচ সম্মানের জায়গায় এসে আমাদের অস্তিত্বই যেন অস্বীকার করা হলো। এই মন্তব্যগুলিই এখন বরাকের রাজনৈতিক আবহে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কারণ, দীর্ঘদিন ধরে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়ার পরও যদি একটি অঞ্চল প্রতিনিধিত্ব না পায়, তাহলে সেখানে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অনেকের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার হতাশা নয়, এটি বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক গুরুত্ব, আত্মসম্মান এবং ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বরাকের সাধারণ মানুষের মনেও এখন প্রশ্নের ঝড়। কোথায় গেলেন সেই সব নেতারা, যাঁদের প্রতিটি বক্তৃতা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রশংসায় মুখর থাকে? যাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান শুরু হয় দিল্লির বন্দনায় এবং শেষ হয় দিসপুরের প্রশস্তিতে? আজ নিজেদের এলাকার ন্যায্য দাবি আদায়ের প্রশ্নে তাঁদের কণ্ঠস্বর এত ক্ষীণ কেন?

দিসপুরের দরবারে গিয়ে কেন তাঁরা বরাকের হয়ে জোরালো দাবি তুলতে পারলেন না? সমালোচকরা তাদের মত প্রকাশ করে বলেন, বরাকের বহু নেতা ব্যক্তিগত আনুগত্য প্রদর্শনে সিদ্ধহস্ত হলেও জনস্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে তাঁরা ব্যর্থ। রাজনৈতিক আনুগত্য আর আত্মসমর্পণের মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে, তা বুঝতে না পারার ফলেই আজ বরাক এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। নেতাদের একাংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা মানুষের প্রতিনিধি হওয়ার বদলে কেবল উপরওয়ালাদের খুশি রাখার রাজনীতিতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে বরাকের অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মর্যাদার প্রশ্নগুলো গুরুত্ব হারাচ্ছে।

এই বিতর্কের মাঝেই রাজনৈতিক মহলের একাংশ উদাহরণ হিসেবে সামনে আনছেন হোজাইয়ের শিলাদিত্য দেবের নাম। তাঁদের মতে, হোজাইয়ের এই অভিজ্ঞ বাঙালি বিধায়ককে অন্তত প্রতীকীভাবেও মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া যেত। কারণ, তা হলে অন্তত একটি বার্তা স্পষ্ট হতো যে অসমের বাঙালি সমাজকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়নি এবং রাজ্যের ক্ষমতার কাঠামোয় তাঁদের উপস্থিতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের বক্তব্য, মন্ত্রিসভায় একজন বাঙালি মুখ অন্তর্ভুক্ত করা শুধু রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন ছিল না, এটি ছিল মানসিক ও সামাজিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়ও। বরাক উপত্যকা-সহ অসমের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারত। বিশেষ করে যখন নির্বাচনে বাঙালি ভোটারদের বড় অংশ শাসকদলের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তখন তাঁদের মধ্যে ন্যূনতম রাজনৈতিক আস্থার বার্তা পৌঁছে দেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মত অনেকের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সম্ভাবনাও বাস্তবায়িত হয়নি।

আর এরপরই উঠতে শুরু করেছে একের পর এক প্রশ্ন। রাজনৈতিক মহলের অভিযোগ, অন্তত সৌজন্যবশতও যদি একজন বাঙালি প্রতিনিধিকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হতো, তাহলে বর্তমানের এই তীব্র বঞ্চনার অনুভূতি অনেকটাই প্রশমিত হতে পারত। কিন্তু সেই ন্যূনতম রাজনৈতিক সৌজন্যও দেখানো হয়নি বলেই এখন ক্ষোভ আরও তীব্র আকার নিচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে একটি স্পষ্ট বার্তা গিয়েছে, নির্বাচনের সময় বাঙালিদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ক্ষমতার অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে তাঁদের গুরুত্ব অনেকটাই কম। আর এই ধারণাই এখন বরাক উপত্যকা থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।

বরাকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির একাংশও এখন সরব। তাঁদের মতে, এটি শুধু একটি মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার ঘটনা নয়, এটি বরাকের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বহনকারী এই উপত্যকা বহুবার নিজের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছে। অথচ আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই বরাককেই যেন বারবার প্রান্তিক করে রাখা হচ্ছে।

অনেকের মতে, বরাকের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতাই আজকের এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। কারণ, গণতন্ত্রে প্রতিনিধিত্ব কখনও দয়া করে দেওয়া হয় না; তা রাজনৈতিক দরকষাকষি, সংগঠিত চাপ এবং নেতৃত্বের দৃঢ়তার মাধ্যমে আদায় করে নিতে হয়। কিন্তু বরাকের নেতারা সেই রাজনৈতিক দৃঢ়তা দেখাতে পারেননি বলেই অভিযোগ। বরং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ও চাটুকারিতার সংস্কৃতি বরাকের রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। কারণ, একটি অঞ্চল যখন ধারাবাহিকভাবে ভোট দেয় কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে প্রতিনিধিত্ব পায় না, তখন সেখানে বঞ্চনার মনোভাব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আর সেই বঞ্চনা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমীকরণেও তার প্রভাব পড়তে পারে। সাধারণ মানুষের একাংশের বক্তব্য আরও তীব্র। তাঁদের কথায়, ভোটের আগে বরাকের দরজায় দরজায় গিয়ে সমর্থন চাওয়া হয়, কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর বরাককে ভুলে যাওয়া হয়। কেউ কেউ আবার বলছেন, বরাকের মানুষ শুধু আবেগ দিয়ে ভোট দিয়েছেন, কিন্তু রাজনৈতিক হিসাব কষেননি। ফলে প্রাপ্য সম্মান আদায় করাও সম্ভব হয়নি।

এখন প্রশ্ন উঠছে, এই ঘটনার পর বরাকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে? চাটুকারিতার রাজনীতি কি আরও গভীর হবে, নাকি নতুন করে অধিকারের রাজনীতি শুরু হবে? কারণ, ইতিহাস বলছে, যে অঞ্চল নিজের অধিকার আদায়ের লড়াই ভুলে যায়, তাকে বারবার বঞ্চনার শিকার হতে হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সমগ্র অসম থেকে একজন বাঙালিও ক্যাবিনেটে জায়গা পাননি। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এটাই কি সেই রাজনৈতিক সম্মান যা বরাকবাসী আশা করেছিল? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সবকা সাথ, সবকা বিকাশ স্লোগানটি কি তবে বরাকের ভৌগোলিক সীমানায় এসে থমকে গেল?

দিসপুরের নতুন মন্ত্রিসভাকে অভিনন্দন জানিয়েও বরাকের মানুষ আজ এক গভীর বেদনার কথা বলছেন। তাঁদের মতে, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি যত বড়ই হোক, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কোনো অঞ্চলের আত্মসম্মান পূর্ণতা পায় না। আর সেই কারণেই এবারের মন্ত্রিসভা বরাকের কাছে শুধু একটি প্রশাসনিক তালিকা নয়; এটি বঞ্চনার প্রতীক হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বরাকের মানুষ এখন সময়ের দিকে তাকিয়ে। তাঁরা দেখছেন, তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এই অপমানের বিরুদ্ধে আদৌ মুখ খুলবেন কি না। কারণ, করতালির রাজনীতি দিয়ে সাময়িক জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়, কিন্তু মানুষের সম্মান রক্ষার লড়াই করতে লাগে সাহস, মেরুদণ্ড এবং আত্মসম্মান। আর সেই পরীক্ষাতেই আজ বরাকের রাজনীতি কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে। 

Related Posts

কাটিগড়ায় যানজটের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযান

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১৪ মেঃ দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট, অবৈধ পার্কিং, রাস্তা দখল এবং নিয়ন্ত্রণহীন যান চলাচলের কারণে কার্যত নাজেহাল হয়ে উঠেছিল কাটিগড়া বাজার এলাকা। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চেরাগী…

শ্রীভুমি জেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল মৃত্যুফাঁদে পরিণত

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১৪ মেঃ শ্রীভুমিজেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল আজ যেন ধুঁকতে থাকা এক ভাঙাচোরা চরম বেহাল দশা। বাইরে থেকে বিশাল ভবন, সরকারি উন্নয়নের নানা দাবি, কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলেই…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *