বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১৪ মেঃ দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট, অবৈধ পার্কিং, রাস্তা দখল এবং নিয়ন্ত্রণহীন যান চলাচলের কারণে কার্যত নাজেহাল হয়ে উঠেছিল কাটিগড়া বাজার এলাকা। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চেরাগী বাজার, চৌরঙ্গী বাজার ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানজট এমন পর্যায়ে পৌঁছাত যে সাধারণ মানুষের চলাচলই দুর্বিষহ হয়ে পড়ত। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া থেকে শুরু করে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। অবশেষে জনদুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে এবার কড়া পদক্ষেপ নিল প্রশাসন।
জানা গেছে, কাটিগড়া রাজস্ব চক্রের সার্কল অফিসার যাত্রা কান্ত কর্মকার গত ১১ মে এক বিশেষ নির্দেশনা জারি করে এলাকায় যানজটের প্রধান কারণগুলো চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ জারির পর বুধবার কাটিগড়া থানার ওসি নীলকমল বড়ুয়ার নেতৃত্বে প্রশাসনের একদল কর্মকর্তা চেরাগী বাজার ও চৌরঙ্গী বাজার এলাকায় বিশেষ অভিযান চালান। অভিযানে রাস্তার দুপাশে অবৈধভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা গাড়ি সরিয়ে দেওয়া হয়, ফুটপাত ও রাস্তার অংশ দখলমুক্ত করা হয় এবং চালকদের কঠোরভাবে ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রাস্তা দখল ও অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ প্রশাসনের
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, বাজার এলাকায় নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা চালু করা, গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে নিয়মিত পুলিশ মোতায়েনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু একদিনের অভিযানেই সমস্যার সমাধান হবে না বলেই মনে করছেন এলাকার সচেতন মহল। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বাজার এলাকার রাস্তাগুলো কার্যত দখলদারদের কবলে চলে গেছে।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে অবাধে পণ্য ফেলে রাখা, যত্রতত্র অটো ও পিকআপ ভ্যান দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা, অবৈধ পার্কিং এবং রাস্তার ধারে অস্থায়ী দোকান বসানোর ফলে যান চলাচলের জন্য রাস্তা ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। অথচ প্রশাসনের চোখের সামনে এসব চললেও অতীতে খুব একটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ।
চেরাগী বাজার এলাকায় দিনদিন তীব্র আকার নিচ্ছে যানজট সমস্যা। বাজারের প্রধান সড়কজুড়ে প্রতিদিন দীর্ঘক্ষণ ধরে যানবাহনের চাপ সৃষ্টি হওয়ায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রী ও তাঁদের অভিভাবকেরা। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে এলাকাজুড়ে বাড়ছে ক্ষোভ। চেরাগী বাজারের এক প্রবীণ ব্যবসায়ী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, প্রতিদিন বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে অনেক ক্রেতাই দোকানে আসতে চান না।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার ভয়ে মানুষ বাজারমুখী হওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যবসার উপর। বিক্রি কমে যাচ্ছে, ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে ছোট ব্যবসায়ীদের। তিনি আরও বলেন, নিয়মিত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক অভিযান চালানো হলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হতে পারে।
অন্যদিকে, সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রী ও তাঁদের অভিভাবকেরা। অভিযোগ, প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় চেরাগী বাজার এলাকায় ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়। ফলে বহু ছাত্রছাত্রীকে দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকতে হয়। অনেক সময় পরীক্ষার্থী এবং ছোট ছোট পড়ুয়ারাও দেরিতে স্কুলে পৌঁছায়। এক অভিভাবকের কথায়, স্কুলের সময় বাজার এলাকায় যে জ্যাম হয়, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
স্বস্তির আশায় ব্যবসায়ী-শিক্ষার্থী-পথচারীরা, তবে প্রশ্ন, অভিযান কি স্থায়ী সমাধান আনতে পারবে?
শুধু দেরি নয়, বাচ্চাদের নিরাপত্তা নিয়েও আতঙ্কে থাকতে হয়। রাস্তা পার হওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। চারদিকে গাড়ির চাপ, হর্নের শব্দ আর বিশৃঙ্খল পরিবেশে প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজার এলাকায় অবৈধ পার্কিং, নিয়মভঙ্গ করে যানবাহন দাঁড় করানো এবং পর্যাপ্ত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের অভাবেই এই সমস্যা ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং স্থায়ী সমাধানের দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ।
পথচারীদের অভিযোগ, বাজার এলাকায় ফুটপাত না থাকায় জীবন হাতে নিয়ে চলাচল করতে হয়। যানজটের কারণে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও প্রায়শই ঘটে চলেছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনের অভিযানের পাশাপাশি স্থায়ী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা না হলে সমস্যা ফের আগের জায়গায় ফিরে যাবে।
সচেতন মহলের দাবি, কাটিগড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। বাজার এলাকায় স্থায়ী পার্কিং জোন তৈরি, অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, রাস্তার পাশে নিয়ন্ত্রিত হকার জোন নির্ধারণ এবং ট্রাফিক পুলিশের নিয়মিত তদারকি ছাড়া যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
তবে বুধবারের অভিযানের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসন যদি রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপ উপেক্ষা করে ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালিয়ে যায়, তাহলে কাটিগড়াবাসী বহুদিন পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবেন। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের এই তৎপরতা সাময়িক অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি সত্যিই কাটিগড়ার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে বড় পদক্ষেপ হয়ে ওঠে।





