বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১৪ মেঃ পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং ভারতীয় টাকার উপর বাড়তে থাকা চাপের আবহে বড় অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিল কেন্দ্রীয় সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জনগণকে অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানোর মাত্র দুদিনের মধ্যেই কেন্দ্র সরকার সোনা, রূপা এবং অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর উপর আমদানি শুল্ক দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ৬ শতাংশ থেকে সরাসরি ১৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে।
মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রকের জারি করা এই বিজ্ঞপ্তি কার্যকর হয়েছে ১৩ মে থেকেই। সরকারের এই সিদ্ধান্তে আগামী দিনে দেশের বাজারে সোনা-রূপার দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়েছে। অর্থ মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শুধু মূল আমদানি শুল্কই নয়, মূল্যবান ধাতুর উপর আরোপিত সমাজকল্যাণ সারচার্জ এবং কৃষি অবকাঠামো ও উন্নয়ন সেস এও সংশোধন আনা হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষায় কেন্দ্রের কড়া সিদ্ধান্ত, বাড়তে পারে গয়নার দাম
সরকারের যুক্তি, আন্তর্জাতিক সংকটের সময় বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের উপর চাপ কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় বিলাসপণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের উপর, বিশেষত বিয়ের মরশুমে গয়না কেনার ক্ষেত্রে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে হায়দরাবাদে এক জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী দেশের জনগণের প্রতি সংযমী অর্থনৈতিক আচরণের আহ্বান জানান। তিনি জ্বালানির ব্যবহার কমানো, গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর এড়িয়ে চলা এবং বিশেষ করে অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছিল যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্র যথেষ্ট উদ্বিগ্ন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষাকে এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের সোনা আমদানি ২৪ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ৭১.৯৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যদিও আমদানিকৃত সোনার পরিমাণ সামান্য কমে ৭২১.০৩ টনে দাঁড়িয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার উচ্চমূল্যের কারণে মোট আমদানি ব্যয় বিপুল হারে বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং ভারতীয় টাকার উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ইতিমধ্যেই তার প্রভাব বাজারে পড়তে শুরু করেছে। মঙ্গলবার দিল্লির বাজারে সোনার দাম এক ধাক্কায় ১,৫০০ টাকা বেড়ে প্রতি ১০ গ্রামে ১,৫৬,৮০০ টাকায় পৌঁছায়। অন্যদিকে রূপার দামও লাফিয়ে বেড়ে প্রতি কিলোগ্রামে ২,৭৭,০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গয়না ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নতুন আমদানি শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাজারে আরও বড় মূল্যবৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে সোনা-রূপা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্র সরকারের এই সিদ্ধান্তের পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হল পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতি। ওই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের আমদানি ব্যয়ের উপর। কারণ ভারত তার জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। এর সঙ্গে সোনা আমদানির বিপুল ব্যয় যুক্ত হওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের উপর চাপ আরও বেড়ে চলেছে।
আমদানি শুল্ক বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৪-২৫ সালের বাজেটে কেন্দ্র সরকার সোনার আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৬ শতাংশ করেছিল। তখন সরকারের যুক্তি ছিল, এতে রত্ন ও গয়না শিল্পে গতি আসবে এবং চোরাচালান কমবে। বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ফলও দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সরকারকে আবার আগের কঠোর নীতিতে ফিরতে হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এটি অবশ্য প্রথম নয়। এর আগেও ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালীন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় ভারত সোনার উপর আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল।
তখনও লক্ষ্য ছিল চলতি হিসাবের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ভারতীয় মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। মঙ্গলবার দেশের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি. অনন্ত নাগেশ্বরন পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতকে ভারতের জন্য একটি লাইভ ব্যালেন্স অব পেমেন্ট স্ট্রেস টেস্ট বলে অভিহিত করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভারতীয় টাকার আরও অবমূল্যায়নের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এদিকে মঙ্গলবার ভারতীয় টাকার মূল্য মার্কিন ডলারের বিপরীতে রেকর্ড ৯৫.৬৩-এ পৌঁছেছে, যা দেশের অর্থনীতির উপর ক্রমবর্ধমান চাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে শুধু আমদানি শুল্ক বাড়ালেই চলবে না, বরং জ্বালানি নির্ভরতা কমানো, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের কৌশল হিসেবে দেখা হলেও, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজার অর্থনীতির উপর তার প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের এই কড়া পদক্ষেপ দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে কতটা সফল হয়, নাকি এর প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলে।







