আবারও বাড়ল দুধের দাম!

বর্তমানে রান্নার গ্যাস, সবজি, ডাল, চাল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম আকাশছোঁয়া। তার মাঝেই দুধের মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। কারণ শিশুদের পুষ্টি, সকালের চা, কফি, মিষ্টি প্রস্তুত, এমনকি অসুস্থ মানুষের খাদ্যতালিকাতেও দুধ অপরিহার্য একটি উপাদান। ফলে এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের কোটি কোটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে।

গুজরাট কো-অপারেটিভ মিল্ক মার্কেটিং ফেডারেশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গরুর খাদ্য, পশুখাদ্যের কাঁচামাল, প্যাকেজিং সামগ্রী, পরিবহণ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণেই দুধের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে সংস্থাটি। সংস্থার দাবি, গত কয়েক মাসে উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় পুরনো দামে বাজারে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, প্রতিবারই উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে কেন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে? বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, খাদ্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত ছিল। কারণ একের পর এক মূল্যবৃদ্ধির ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের সঞ্চয় ভেঙে পড়ছে এবং নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন।

এই নতুন মূল্যবৃদ্ধির ফলে আমূলের একাধিক জনপ্রিয় দুধের দাম বেড়ে যাবে। নতুন তালিকা অনুযায়ী, আমূল গোল্ডের দাম ৬৮ টাকা থেকে বেড়ে প্রতি লিটারে ৭০ টাকা হবে। মহিষের দুধের দাম ৭৪ টাকা থেকে বেড়ে ৭৬ টাকা, গরুর দুধ ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা এবং স্লিম অ্যান্ড ট্রিম ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৫২ টাকা হবে। এছাড়াও আমূল তাজা, স্ট্যান্ডার্ড মিল্ক এবং টি-স্পেশালের মতো অন্যান্য জনপ্রিয় ভ্যারিয়েন্টের দামও বৃদ্ধি পাবে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি দ্বিতীয় বড় মূল্যবৃদ্ধি। এর আগেও ২০২৫ সালের ১ মে আমূল প্রতি লিটারে ২ টাকা করে দাম বাড়িয়েছিল। সেই সময় মাদার ডায়রি ও দুধের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। গত বছরের জুন মাসেও আমূল বিভিন্ন ধরনের দুধের দাম ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন প্রশ্ন উঠছে, দুধের দাম কি ধীরে ধীরে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে?

শুধু গৃহস্থ পরিবারই নয়, এই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা পড়বে ছোট ব্যবসার ওপরও। চায়ের দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান, বেকারি এবং রাস্তার ধারের ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসায়ীরা এখন নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কারণ দুধের দাম বাড়লে তাঁদের উৎপাদন খরচও বাড়বে। ইতিমধ্যেই অনেক ছোট ব্যবসায়ী ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরিস্থিতি এমন চলতে থাকলে তাঁদেরও চা, কফি, মিষ্টি কিংবা অন্যান্য খাদ্যপণ্যের দাম বাড়াতে হতে পারে।

এক চা দোকান মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিদিন দুধের দাম বাড়ছে, গ্যাসের দাম বাড়ছে, চিনি-চায়ের পাতার দামও কম নয়। কিন্তু আমরা যদি চায়ের দাম বাড়াই, তখন ক্রেতারাই কমে যায়। ছোট ব্যবসা চালানো এখন খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে গৃহিণীদের একাংশ বলছেন, সংসারের বাজেট সামলানো এখন কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছে। এক গৃহবধূর কথায়, মাসের শুরুতে যে বাজেট করি, মাস শেষ হওয়ার আগেই সব ওলটপালট হয়ে যায়। প্রতিদিন কিছু না কিছু জিনিসের দাম বাড়ছেই।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুগ্ধ শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি বাস্তব সমস্যা হলেও দীর্ঘমেয়াদে বারবার মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশু খাদ্য, পুষ্টি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রে এর প্রভাব গভীর হতে পারে। রাজনৈতিক মহলেও এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, কেন্দ্র সরকার মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তাঁদের দাবি, একের পর এক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়লেও সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

যদিও সরকার পক্ষের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, দুধের মতো অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্যের লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি এখন সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে যখন প্রায় প্রতিটি জিনিসের দামই ঊর্ধ্বমুখী, তখন আবারও দুধের দাম বাড়ায় মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে চাপ আরও বেড়ে গেল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

Related Posts

৭.৮ শতাংশ জিডিপি গ্রোথের নেপথ্যে কি তবে শুধুই ফাঁকা আওয়াজ?

শেয়ার বাজারের পতন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামছাড়া দাম সাধারণ মানুষের বাস্তব চিত্রটাকেই সম্পূর্ণ উলটো করে দিচ্ছে। বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের রিয়েল জিডিপি গ্রোথ রেট…

জোটেনি মাথার উপর ছাদটুকু! এক বছর ধরে অন্যের বাড়িতে দিন কাটছে দেশের প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির, নেপথ্যে কোন প্রশাসনিক রহস্য?

আইন অনুযায়ী ‘টাইপ এইট’ বাংলো এবং রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য হলেও, এক বছর ধরে হরিয়ানার ফার্মহাউসে কাটাতে হচ্ছে জগদীপ ধনকড়কে। বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ রাজনীতির অন্দরমহলে নাটকীয় পটপরিবর্তন নতুন কিছু…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *