কেবিনেট বৈঠকের পর দীর্ঘ সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। তিনি জানান, আগামী ২৬ মে বিধানসভার অধিবেশনের শেষ দিন ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি বিলটি বিধানসভায় উত্থাপন করা হবে। ইতিমধ্যেই কেবিনেট ইউসিসির খসড়া অনুমোদন করেছে।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ইউসিসির আওতা থেকে জনজাতীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে বাইরে রাখা হবে। পাশাপাশি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, পূজা, নামাজ, বিয়ের ধর্মীয় রীতি এসব বিষয়েও সরকার হস্তক্ষেপ করবে না। তবে বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ, বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা, নারীদের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা, বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা, বিবাহবিচ্ছেদের নির্দিষ্ট নিয়ম এবং লিভ-ইন সম্পর্ক সংক্রান্ত বিধান ইউসিসির অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে স্পষ্ট করেন তিনি।

এই ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একাংশের মতে, ইউসিসি নিয়ে সরকারের এই পদক্ষেপ আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণ এবং নারীদের সম্পত্তির অধিকারের মতো বিষয়কে সরকার সামাজিক সংস্কারের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে বেকার যুবকদের জন্যও বড় ঘোষণা করেছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে দুই লক্ষ সরকারি চাকরি প্রদানের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে সরকার। এই বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়া কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ধারণের জন্য মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এই টাস্ক ফোর্স তাদের রিপোর্ট জমা দেবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে দুই লক্ষ চাকরির প্রতিশ্রুতি সরকারকে রাজনৈতিকভাবে বড় সুবিধা দিতে পারে। যদিও বিরোধীদের একাংশ ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে, এই বিপুল সংখ্যক চাকরি আদৌ বাস্তবে কতটা সম্ভব?

এদিনের কেবিনেটে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংগীতসূর্য ভূপেন হাজৰিকাৰ জন্মজয়ন্তী উদযাপনের সমাপনী অনুষ্ঠান আগামী ৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে আয়োজন করা হবে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ভূপেন হাজৰিকাৰ নামে একটি আধুনিক সংগ্রহশালা নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে কেবিনেট। এর মধ্যে ১৩ কোটি টাকা দেবে নর্থইস্ট কাউন্সিল এবং বাকি ২০ কোটি টাকা ব্যয় করবে অসম সরকার। শ্ৰীমন্ত শংকরদেব কলাক্ষেত্রে এই সংগ্রহশালা গড়ে তোলা হবে।

তবে সবচেয়ে বেশি চর্চায় এসেছে সরকারের ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্ত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিদেশি মুদ্রা সঞ্চয় ও অপচয় রোধে যে বার্তা দিয়েছেন, তার প্রেক্ষিতেই অসম সরকার একাধিক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

সরকারি খরচ কমানোর লক্ষ্যে আগামী ছয় মাস অসম সরকার কোনও নতুন গাড়ি কিনবে না বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত নতুন মন্ত্রীদেরও আগামী ছয় মাস নতুন সরকারি গাড়ি দেওয়া হবে না। তাঁদের পুরনো গাড়িতেই কাজ চালাতে হবে।

শুধু তাই নয়, আগামী ছয় মাস কোনও সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী সরকারি বা ব্যক্তিগত খরচে বিদেশ সফরে যেতে পারবেন না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে সরকার। শুধুমাত্র চিকিৎসাজনিত কারণেই বিদেশ যাওয়ার অনুমতি মিলবে। সরকারি বিদেশ সফরের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর আগাম অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, রাজ্যপাল থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী ও শীর্ষ আধিকারিকদের কনভয়ের গাড়ির সংখ্যাও কমিয়ে আনা হবে। আগামী ছয় মাস সরকারি জ্বালানি খরচ ২০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কম ভ্রমণ, কম গাড়ি ব্যবহার এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই লক্ষ্য পূরণ করা হবে বলে সরকার জানিয়েছে।

একইসঙ্গে বিদেশি পণ্য ক্রয়ের উপরও কার্যত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে অসম সরকার। আগামী ছয় মাস সরকার কোনও বিদেশি পণ্য কিনবে না বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া সভা, কর্মশালা ও বড় সরকারি অনুষ্ঠান সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ভিডিও কনফারেন্স ও অনলাইন বৈঠক চালিয়ে যাওয়া হবে।

পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারি কাজে গাড়ি ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে ইভি বা বৈদ্যুতিক গাড়িকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি অসমে ১৫ থেকে ২০ বছর পুরনো সমস্ত যানবাহন স্ক্র্যাপ করার সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছে।

সব মিলিয়ে দ্বিতীয় কার্যকালের প্রথম কেবিনেট বৈঠকেই মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শৰ্মা প্রশাসনিক কড়াকড়ি, অর্থনৈতিক সাশ্রয়, সাংস্কৃতিক উদ্যোগ এবং সামাজিক সংস্কারের মিশ্র বার্তা দিলেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এখন নজর থাকবে এই ঘোষণাগুলি বাস্তবে কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার উপর।