হিল্লোল দত্ত বরাকবাণী ডিজিটাল শ্রীভূমি ২৪ মার্চঃ আসন্ন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে জাঁকজমকপূর্ণ শক্তি প্রদর্শন, মিছিল-মিটিং ও জনসমাবেশে সরগরম রাজনৈতিক ময়দান, ঠিক সেই সময় শ্রীভুমি জেলায় ধরা পড়ল এক ভিন্ন রাজনৈতিক চিত্র। চোখ ধাঁধানো শোডাউন বা বিপুল জনসমর্থকদের ঢল নয়, বরং সংযত, সুসংগঠিত এবং সীমিত সংখ্যক কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতিতেই মনোনয়ন দাখিল করলেন জেলা কংগ্রেসের প্রার্থীরা।
এই ভিন্নধর্মী উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি নিছক সংযম নয়, বরং এক কৌশলগত বার্তা অতিরিক্ত প্রদর্শনের বদলে সংগঠনের ভিত মজবুত করার উপর জোর দিচ্ছে কংগ্রেস। সোমবার শ্রীভুমি জেলা নির্বাচন আধিকারিকের কার্যালয় চত্বরে দিনভর ছিল রাজনৈতিক কর্মব্যস্ততা। একে একে বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থীরা উপস্থিত হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দলীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়, তবে কোথাও ছিল না অযথা ভিড় বা প্রদর্শন যা অন্যান্য দলের কার্যক্রমের তুলনায় স্পষ্টভাবেই আলাদা চিত্র তুলে ধরেছে।
শ্রীভুমিতে একে একে প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত জেলা নেতৃত্বের
জেলা কংগ্রেস সূত্রে জানা গেছে, এই সংযত মনোনয়ন প্রক্রিয়া ছিল পূর্বপরিকল্পিত। অপ্রয়োজনীয় জনসমাগম এড়িয়ে নির্বাচনী বিধিনিষেধ মেনে চলা এবং সাধারণ মানুষের কাছে একটি পরিণত ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি তুলে ধরাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, করিমগঞ্জে কংগ্রেসের এই ‘লো-প্রোফাইল’ কৌশল আসলে আত্মবিশ্বাসেরই বহিঃপ্রকাশ। কারণ, সাধারণত যে দল নিজেদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চিত থাকে, তারাই বেশি করে শক্তি প্রদর্শনের পথে হাঁটে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কংগ্রেসের এই সংযত পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, দলটি সংগঠনের ভিত এবং জনসংযোগের উপরই বেশি ভরসা রাখছে।

তবে বাস্তবতা হলো, সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন লড়াই। রাজ্য ও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র সংগঠনগত শক্তি এবং প্রশাসনিক প্রভাবকে মোকাবিলা করা কংগ্রেসের জন্য সহজ হবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সোমবার দিনভর করিমগঞ্জ জেলা নির্বাচন আধিকারিকের কার্যালয় কার্যত কংগ্রেসের প্রার্থীদের পদচারণায় সরগরম হয়ে ওঠে। জেলার বিভিন্ন বিধানসভা আসনের প্রার্থীরা একে একে উপস্থিত হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল দলীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি, তবে ছিল না অযথা বাহুল্য যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
উত্তর করিমগঞ্জে আত্মবিশ্বাসী জাকারিয়া
দিনের শুরুতেই উত্তর করিমগঞ্জ বিধানসভা আসনের কংগ্রেস প্রার্থী জাকারিয়া আহমদ (পান্না) মনোনয়ন দাখিল করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জেলা কংগ্রেস সভাপতি তাপস পুরকায়স্থ, প্রবীণ নেতা সুব্রত দেব এবং তন্ময় মজুমদারসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জাকারিয়া দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, এইবার উত্তর করিমগঞ্জে কুড়ি থেকে পঁচিশ হাজার ভোটে জয়ী হব। তিনি আরও দাবি করেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের সমর্থন তাঁর পাশে রয়েছে। শাসকদলের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষই কংগ্রেসের পক্ষে ফল দেবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

দক্ষিণ করিমগঞ্জে চ্যালেঞ্জহীন দাবি
অন্যদিকে দক্ষিণ করিমগঞ্জে কংগ্রেস প্রার্থী আমিনূর রশিদ চৌধুরী (সামিম) মনোনয়ন দাখিল করেন বিশিষ্ট আইনজীবী আব্দুল সব্বুর তাপাদার, শাহাদত আহমদ চৌধুরী এবং রাজন চৌধুরীসহ দলের অন্যান্য নেতাদের উপস্থিতিতে। মনোনয়ন পর্ব শেষে তিনি বলেন, দক্ষিণ করিমগঞ্জে কংগ্রেসের জয় এবার নিশ্চিত। এজিপি ও তৃণমূল কংগ্রেস কেউই আমার কাছে চ্যালেঞ্জ নয়। দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কাজ এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগই তাঁর মূল শক্তি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রামকৃষ্ণনগরে সুরুচির ভরসা জনসমর্থনে
রামকৃষ্ণনগর আসনের কংগ্রেস প্রার্থী সুরুচি রায় যদিও দুদিন আগেই মনোনয়ন জমা দিয়েছেন, তবুও সোমবার তিনি নিজের জয়ের ব্যাপারে প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তাঁর কথায়, জনগণের সমর্থনই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই বিশ্বাস নিয়েই নির্বাচনে লড়ছি।”
পাথারকান্দিতে পুরনো সমীকরণ, নতুন আশা
দিনের শেষে পাথারকান্দি বিধানসভা আসনে মনোনয়ন দাখিল করেন প্রাক্তন বিধায়ক কার্তিক সেনা সিনহা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রাক্তন বিধায়ক মণিলাল গোয়ালা এবং টিকিটপ্রত্যাশী প্রতাপ সিনহা যা দলীয় ঐক্যের এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কার্তিক সেনা সিনহা বলেন, আমি শতভাগ আশাবাদী, এবার পাথারকান্দিতে কংগ্রেস জয়ী হবে। অন্যদিকে প্রতাপ সিনহাও জানান, দলের কর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন এবং শুধু একটি আসন নয়, গোটা জেলাতেই কংগ্রেস ভালো ফল করবে।
উত্তর থেকে পাথারকান্দি সব আসনেই জয়ের বার্তা, গৌরব গগৈয়ের নেতৃত্বে আশাবাদী দল লড়াইয়ের বার্তা
মনোনয়ন পর্ব শেষে জেলা কংগ্রেস সভাপতি তাপস পুরকায়স্থ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জেলার প্রতিটি আসনেই এবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তিনি স্বীকার করেন, কেন্দ্র ও রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় থাকায় শাসকদল কিছুটা বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। তবে তাঁর দৃঢ় বক্তব্য, বিজেপির একনায়কতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষই এবার জবাব দেবে।
একই সুর শোনা যায় জেলা কংগ্রেসের মিডিয়া ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান শাহাদত আহমদ চৌধুরীর কথাতেও। তিনি দাবি করেন, গৌরব গগৈ এর নেতৃত্বে বরাক উপত্যকা থেকে শুরু করে গোটা অসমেই কংগ্রেসের আসন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সীমিত সমর্থক নিয়ে মনোনয়ন, চার কেন্দ্রেই জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী প্রার্থীরা
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এদিনের মনোনয়ন পর্বে কংগ্রেসের লো-প্রোফাইল কৌশল আসলে একটি সুপরিকল্পিত বার্তা অতিরিক্ত প্রদর্শন নয়, বরং সংগঠনের ভিত মজবুত করাই মূল লক্ষ্য। বিজেপির জাঁকজমকপূর্ণ শক্তি প্রদর্শনের বিপরীতে কংগ্রেসের এই সংযত উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা অবশ্যই সময় বলবে। তবে এটুকু স্পষ্ট, করিমগঞ্জ জেলায় এবার নির্বাচন লড়াই হতে চলেছে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং রুদ্ধশ্বাস।
সব মিলিয়ে, করিমগঞ্জে কংগ্রেসের মনোনয়ন পর্ব যেন এক নীরব বার্তা দিয়ে গেল, রাজনীতিতে শুধু শোরগোল নয়, সংগঠনের শক্তি, কৌশল এবং জনবিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয় জয়-পরাজয়ের সমীকরণ। এখন দেখার, এই সংযত সূচনা ভোটবাক্সে কতটা সফল পরিণতি এনে দিতে পারে।


