হিল্লোল দত্ত বরাকবাণী ডিজিটাল শ্রীভূমি ২৪ মার্চঃ আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে শ্রীভূমি জেলায় সোমবার কার্যত শক্তি প্রদর্শনের এক বিশাল রাজনৈতিক মহড়া গড়ে তুলল বিজেপি ও তাদের মিত্রজোট। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরজুড়ে যে বর্ণাঢ্য পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তা যেন নির্বাচন-পূর্ব উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিল। ঢাক-ঢোলের তালে তালে এগিয়ে চলা শোভাযাত্রা, গেরুয়া পতাকার ঢেউ এবং উচ্ছ্বসিত জনতার উপস্থিতিতে গোটা শ্রীভূমি শহর এক অনন্য রাজনৈতিক উৎসবে পরিণত হয়।

পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ভোরের আলো ফুটতেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কর্মী-সমর্থকদের ঢল নামে। রামকৃষ্ণনগর, পাথারকান্দি, উত্তর করিমগঞ্জ এবং দক্ষিণ করিমগঞ্জ এই চারটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে হাজার হাজার বিজেপি সমর্থক শোভাযাত্রার মাধ্যমে শ্রীভূমি শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মিছিলগুলি শহরের প্রবেশপথে একত্রিত হয়ে বিশাল আকার ধারণ করে। প্রতিটি মিছিলে ছিল সুসংগঠিত ব্যানার, দলীয় পতাকা এবং স্লোগানে মুখর কর্মীদের উচ্ছ্বাস, যা স্পষ্টভাবে সংগঠনের শক্তি ও প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।
বর্ণাঢ্য মিছিল, জনস্রোতে জমকালো মনোনয়ন শোভাযাত্রা, উন্নয়নকে হাতিয়ার করে ভোটের লড়াইয়ে নামল বিজেপি-মিত্রজোট
শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত করিমগঞ্জ কলেজের খেলার মাঠ এদিন পরিণত হয় এক বিশাল রাজনৈতিক জমায়েতের কেন্দ্রে। মাঠজুড়ে গেরুয়া পতাকার সমারোহ, মঞ্চের সামনে উপচে পড়া ভিড় এবং চারদিক থেকে ভেসে আসা দলীয় স্লোগান সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক বিদ্যুৎময় পরিবেশ। উপস্থিত জনতার উচ্ছ্বাস এবং অংশগ্রহণ দেখে স্পষ্ট, এই কর্মসূচি শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নির্বাচনের আগে শক্তি প্রদর্শনের একটি সুপরিকল্পিত আয়োজন।
চারটি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থীদের একযোগে মনোনয়ন দাখিলকে কেন্দ্র করে যে ব্যাপক জনসমাগম লক্ষ্য করা গেল, তা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই সমাবেশকে সংগঠনের ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং জনভিত্তির প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরা হয়। একইসঙ্গে, বিরোধীদের উদ্দেশ্যে এটি ছিল এক প্রকার বার্তা, নির্বাচনের ময়দানে বিজেপি ও তাদের জোট যে প্রস্তুত এবং আত্মবিশ্বাসী, তা স্পষ্ট করে দেওয়াই ছিল এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।

দিনভর এই কর্মসূচিকে ঘিরে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানজট ও জনসমাগমের চাপ লক্ষ্য করা গেলেও, প্রশাসনের তৎপরতায় সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। নিরাপত্তার দিকটিও ছিল যথেষ্ট কড়াকড়ি, যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
চার কেন্দ্রে মনোনয়ন দাখিল, বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল গেরুয়া শিবির
প্রায় দুপুর ১২টা নাগাদ শুরু হয় মহা শোভাযাত্রা। ব্যান্ড-পার্টি, তাসা ও ঢাকের তালে তালে শহরের প্রধান সড়কগুলি প্রদক্ষিণ করে মিছিলটি এগিয়ে চলে। ‘বিজেপি জিন্দাবাদ’, ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার জিন্দাবাদ’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। সাধারণ পথচারী থেকে শুরু করে দোকানপাট সবখানেই এই শোভাযাত্রা ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
শহরের বিজেপি কার্যালয়ের সামনে এসে মিছিলে যোগ দেন পাথারকান্দির প্রার্থী তথা মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল, রামকৃষ্ণনগরের প্রার্থী ও বর্তমান বিধায়ক বিজয় মালাকার এবং উত্তর করিমগঞ্জের প্রার্থী সুব্রত ভট্টাচার্য। তাঁদের উপস্থিতিতে মিছিলে নতুন উদ্দীপনা যোগ হয়। নেতাদের ঘিরে কর্মীদের উচ্ছ্বাস, ফুলেল অভ্যর্থনা এবং স্লোগানের তীব্রতা যেন এক নির্বাচনী উৎসবের রূপ নেয়।

মিছিলটি যখন জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে পৌঁছায়, তখন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা মেনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডিসি অফিসের ১০০ মিটার আগে ব্যারিকেড করা হয়। সেই অনুযায়ী, শোভাযাত্রা সেখানেই থামিয়ে প্রার্থীরা একে একে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রবেশ করে তাঁদের মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। পুরো প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, যা প্রশাসনিক প্রস্তুতিরও ইঙ্গিত বহন করে।
এই সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা বিজেপি সভাপতি সঞ্জীব বণিক, প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ মিশন রঞ্জন দাস, উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান বিশ্বরূপ ভট্টাচার্য, পুরপতি রবীন্দ্র দেব, জেলা পরিষদের সভাপতি অনিল কুমার ত্রিপাঠি সহ একাধিক শীর্ষ নেতা ও পদাধিকারী। পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থকের উপস্থিতি গোটা আয়োজনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
মনোনয়ন দাখিলকে কেন্দ্র করে জনউচ্ছ্বাস, জয়ের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ মিত্রজোট
অন্যদিকে, দক্ষিণ করিমগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রেও একই দিনে বিজেপির মিত্রদল অসম গণ পরিষদের প্রার্থী ইকবাল হোসেন মনোনয়ন পত্র জমা দেন। মিত্রজোটের পক্ষ থেকেও সমান উৎসাহ ও আত্মবিশ্বাস লক্ষ্য করা যায়। মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রার্থীরা নিজেদের জয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পাথারকান্দির প্রার্থী কৃষ্ণেন্দু পাল বলেন, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে যে উন্নয়ন হয়েছে, তার ওপর ভর করেই এবার বিজেপি মানুষের দরবারে যাচ্ছে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জনগণ আবারও বিজেপিকে আশীর্বাদ করবে বলেই তাঁর বিশ্বাস।
উত্তর করিমগঞ্জের প্রার্থী সুব্রত ভট্টাচার্য মনোনয়নের আগে টাউন কালীবাড়িতে পূজা দিয়ে শুভ সূচনা করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে, আর সেই বিশ্বাস থেকেই এবারও জয় নিশ্চিত বলে তিনি মনে করেন। রামকৃষ্ণনগরের প্রার্থী বিজয় মালাকারও বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা করে দাবি করেন, এই নির্বাচনে কংগ্রেস কোনোভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকতে পারবে না। বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করবেন বলেও তিনি আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেন।
এদিকে, দক্ষিণ করিমগঞ্জে অগপ প্রার্থী ইকবাল হোসেন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেস—দুই দলই এবার জনসমর্থন হারিয়েছে। বিজেপির মিত্রজোট হিসেবে তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন এবং জয় নিশ্চিত বলেই তাঁর দাবি। সব মিলিয়ে, শ্রীভূমি জেলায় সোমবারের এই মনোনয়ন পর্ব নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক শক্তির এক বড় প্রদর্শনী হিসেবেই চিহ্নিত হচ্ছে। জনসমাগম, শৃঙ্খলাপূর্ণ আয়োজন এবং নেতাদের আত্মবিশ্বাস সবকিছু মিলিয়ে স্পষ্ট যে, আসন্ন নির্বাচনে এই জেলার লড়াই হতে চলেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ।


