রাজু দাস বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ২২ মার্চঃ কাছাড়ের রাজনীতির আকাশে এখন জমাট বাঁধছে অশান্তির কালো মেঘ। আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে ধলাই ও উধারবন্দ কেন্দ্রকে ঘিরে যে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধুমাত্র প্রার্থী বাছাইয়ের হিসাব নিকাশে সীমাবদ্ধ নয় বরং শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টি এর অন্দরমহলের গভীর অসন্তোষ ও দ্বন্দ্বকেই প্রকটভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। টিকিট বণ্টনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ক্ষোভ এখন আর চাপা নেই। বরং তা রীতিমতো প্রকাশ্য বিদ্রোহের রূপ নিয়েছে।
দলীয় শৃঙ্খলার গণ্ডি ভেঙে একের পর এক নেতা নিজের অবস্থান স্পষ্ট করছেন, আর তাতেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়ে উঠছে ক্রমশই অগ্নিগর্ভ। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির কেন্দ্রে রয়েছেন ধলাই কেন্দ্রের প্রাক্তন বিধায়ক নীহার রঞ্জন দাস। দলীয় টিকিট থেকে বঞ্চিত হওয়ার পর তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে নির্দল প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়াই করার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, দলের অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে তাঁকে সরিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দল ও সংগঠনের জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার পরও এমন অবমূল্যায়ন তিনি মেনে নিতে পারেননি বলেই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন।
নীহারবাবুর এই পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির জন্য বড়সড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ধলাই কেন্দ্র শুধু একটি সাধারণ আসন নয় এটি দলীয় শক্তি ও সাংগঠনিক প্রভাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেখানে একজন প্রাক্তন বিধায়কের বিদ্রোহ সরাসরি ভোটের অঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশ এই বিদ্রোহকে ভিন্ন দৃষ্টিতেও দেখছে।
তাঁদের মতে, এটি হয়তো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল। অতীতে এমন বহু নজির রয়েছে যেখানে প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে বিদ্রোহের পথ বেছে নেওয়া নেতারা শেষ মুহূর্তে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছেন। এই প্রসঙ্গে ধলাইয়ের উপনির্বাচনের সময় অমিয় কান্তি দাস এর ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রথমে বিদ্রোহের সুর চড়ালেও শেষ পর্যন্ত তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে বোঝাপড়ায় পৌঁছে পরিস্থিতি সামাল দেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, নীহার রঞ্জন দাসের ক্ষেত্রেও কি সেই একই চিত্র দেখা যাবে, নাকি এবার সত্যিই বড়সড় ভাঙনের মুখে পড়বে বিজেপি?
উধারবন্দ কেন্দ্রেও সমানভাবে অস্থিরতা বিরাজ করছে। দলীয় নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং প্রার্থী বাছাই নিয়ে বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। শীর্ষ নেতৃত্বের পরস্পরবিরোধী মন্তব্য এই অস্থিরতায় যেন ঘি ঢালার কাজ করছে, ফলে তৃণমূল স্তরের কর্মীদের মধ্যেও বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ বাড়ছে। সব মিলিয়ে, কাছাড়ের রাজনৈতিক সমীকরণ এখন এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে।
বিদ্রোহ কি শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পথে গড়াবে, নাকি তা নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে—সেই উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে। তবে এটুকু নিশ্চিত, ধলাই ও উধারবন্দের এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি এবারের নির্বাচনে এক নতুন নাটকীয়তার জন্ম দিতে চলেছে।
অন্যদিকে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছেন সাংসদ পরিমল শুক্লবৈদ্য। শিলচরের দলীয় কার্যালয়ে দাঁড়িয়ে তিনি যে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন, তা কার্যত দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। নীহার রঞ্জন দাসের অভিযোগকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি বলেন, আমি আমার পছন্দের প্রার্থী না হলে পদত্যাগের হুমকি দিয়েছি, এটা প্রমাণ করতে পারলে আমি সাংসদ পদ ছেড়ে দেব।
এই বক্তব্য শুধু আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ নয়, বরং দলীয় কোন্দলের গভীরতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ শাসকদলের ভিতরে বিভাজনের ইঙ্গিত দেয়, যা নির্বাচনের আগে বড় ধাক্কা হতে পারে। ধলাইয়ের পাশাপাশি উধারবন্দ কেন্দ্রেও পরিস্থিতি কম উত্তপ্ত নয়, বরং আরও বিস্ফোরক। একযোগে ৮ জন টিকিট প্রত্যাশীর দলত্যাগ বিজেপির সংগঠনকে কার্যত নাড়িয়ে দিয়েছে।
তাদের অভিযোগ, স্থানীয় নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বহিরাগত প্রার্থী হিসেবে লক্ষীপুরের প্রাক্তন বিধায়ক রাজদ্বীপ গোয়ালাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দলত্যাগীদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে অবহেলা ও অসম্মান এর অভিযোগ। দীর্ঘদিন ধরে দলীয় পতাকা বহন করা কর্মীদের এই ক্ষোভ যে শুধুই ব্যক্তিগত নয়, বরং সাংগঠনিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ তা স্পষ্ট।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই ক্ষোভের পেছনে আদর্শগত প্রশ্নও সামনে এসেছে। দলত্যাগীরা দাবি করেছেন, তারা অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আডবাণীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দলে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান নেতৃত্ব সেই পথ থেকে সরে এসেছে বলেই তাদের অভিযোগ। ত্যাগ করেছি, অপমানও সহ্য করেছি, কিন্তু অন্যায় মেনে নেব না, এই বার্তাই যেন তাদের বক্তব্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
তবে রাজনীতির বাস্তবতা অনেক সময় আদর্শের চেয়ে ভিন্ন পথ দেখায়। অভিজ্ঞ মহলের মতে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে মানভাঙানোর রাজনীতি অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিদ্রোহীদের সঙ্গে একাধিক স্তরে আলোচনা, আশ্বাস, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ফলে নীহার রঞ্জন দাস সহ বর্তমান বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকবেন, নাকি সমঝোতার পথে হাঁটবেন—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
একাংশ বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি কৌশলগত চাপের রাজনীতি ভবিষ্যতের টিকিট নিশ্চিত করতে প্রকাশ্য অসন্তোষ দেখানো। আবার অন্যদের মতে, এটি দলীয় শৃঙ্খলার ভিত ভেঙে পড়ার স্পষ্ট লক্ষণ, যা দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনের জন্য বিপজ্জনক। সব মিলিয়ে কাছাড়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে।
ধলাই ও উধারবন্দে এই অন্তর্দ্বন্দ্ব কি নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে, নাকি শেষ মুহূর্তে সব ঠিক হয়ে যাবে তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আগামী কয়েক দিনের রাজনৈতিক চালচিত্রে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, শাসকদলের এই অন্তরকলহই এবার নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে চলেছে।


