বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ২২ মার্চঃ শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হলো বরাক উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র শিলচর শহরে। সমগ্র রাজ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাছাড় জেলার সর্বত্রই ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়লেও, শহরের ঐতিহ্যবাহী মেহেরপুর ঈদগাহ ময়দান যেন এদিন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল মানবসমুদ্রে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উৎসবের উচ্ছ্বাস এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির অপূর্ব মেলবন্ধনে এক অনন্য আবহ তৈরি হয় গোটা শহরজুড়ে।
শনিবার ভোর থেকেই শিলচরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মুসল্লি নতুন পোশাক পরে ঈদের নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেন নিকটবর্তী ঈদগাহগুলোর দিকে। শহরের প্রতিটি ঈদগাহেই উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেলেও, মেহেরপুর ঈদগাহে ছিল সবচেয়ে বেশি সমাগম। সকাল গড়াতেই বিস্তীর্ণ ঈদগাহ ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে যেখানে শিশু, কিশোর, যুবক থেকে শুরু করে প্রবীণদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
ঈদের নামাজে ইমামতি করেন বিশিষ্ট আলেম মৌলানা আব্দুল ওয়াহিদ সাহেব। নামাজের পূর্বে তিনি তাঁর বয়ানে ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য, আত্মসংযমের শিক্ষা এবং রমজানের মূল বার্তা নিয়ে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ঈদ শুধু আনন্দের দিন নয়, এটি আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও মানবতার চর্চার এক মহান উপলক্ষ। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ, সহমর্মিতা ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার আহ্বান।
কড়া নিরাপত্তায় নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়, কাঁঠাল পয়েন্টে উৎসবের আমেজ, শুভেচ্ছা ও ভ্রাতৃত্বের বার্তায় মুখর শহর
নামাজ শেষে দেশ-জাতির কল্যাণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বিশ্বশান্তি কামনায় বিশেষ মোনাজাত পরিচালিত হয়। সেই মুহূর্তে গোটা ঈদগাহ প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নামাজ শেষে মুসল্লিরা পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, ঈদ মোবারক ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। ঈদের আনন্দ শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে শহরের প্রতিটি অলিগলি ও জনপদে।
মেহেরপুর ঈদগাহ সংলগ্ন কাঁঠাল পয়েন্ট এলাকায় প্রতি বছরের মতো এবারও বসে অস্থায়ী দোকানপাট। খেলনা, বেলুন, মিষ্টান্ন, ফাস্টফুডসহ নানা সামগ্রীর দোকানে উপচে পড়া ভিড় ছিল শিশু-কিশোরদের। রঙিন বেলুন হাতে, নতুন পোশাকে সেজে ওঠা শিশুদের হাসি যেন উৎসবের আসল রূপকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।
এছাড়াও ডিয়ার বয়েজ ক্লাব এর উদ্যোগে কাঁঠাল পয়েন্ট এলাকাকে ঈদ উপলক্ষে বিশেষভাবে সাজানো হয়। আকর্ষণীয় প্রবেশদ্বার, বর্ণিল আলোকসজ্জা এবং নান্দনিক সজ্জায় পুরো এলাকা যেন এক উৎসব প্রাঙ্গণে পরিণত হয়। সন্ধ্যা নামতেই আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে চারদিক, যা শহরের মানুষের কাছে বাড়তি আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, ঈদকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়। ফলে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব সম্পন্ন হয়, যা প্রশাসনের তৎপরতারই প্রমাণ বহন করে। সব মিলিয়ে, এবারের ঈদুল ফিতর শিলচরবাসীর কাছে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এক অনন্য সামাজিক বন্ধন, সম্প্রীতি ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ধরা দিল। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মধ্যে যে মিলনমেলা তৈরি হলো, তা আগামী দিনগুলোর জন্য এক ইতিবাচক বার্তা বহন করে, শান্তি ও সহাবস্থানের বার্তা।


