বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ২২ মার্চঃ শুক্রবার অসম প্রদেশ কংগ্রেসের চতুর্থ প্রার্থী তালিকা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই হাইলাকান্দি বিধানসভা কেন্দ্রের রাজনৈতিক আবহে যেন হঠাৎ করেই আগুন জ্বলে উঠেছে। আসন্ন নির্বাচনের আগে এই কেন্দ্রকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা এখন জেলার অন্যতম আলোচিত বিষয়। কংগ্রেস তাদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে প্রাক্তন বিধায়ক রাহুল রায়ের নাম, অন্যদিকে বিজেপি পুনরায় আস্থা রেখেছে ডঃ মিলন দাসের উপর। ফলে, এই কেন্দ্রে মূল লড়াই যে দুই শিবিরের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
কংগ্রেসের পক্ষে রাহুল রায়কে প্রার্থী করা নিছক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত কৌশল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তিনি ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আলগাপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক হিসেবে কাজ করেছেন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে একটি পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য মুখ।
তার চেয়েও বড় বিষয়, তিনি বর্ষীয়ান নেতা গৌতম রায়ের পুত্র। গৌতম রায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা, সংগঠন দক্ষতা এবং জনভিত্তি আজও হাইলাকান্দি ও আশেপাশের এলাকায় যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। এই পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য রাহুল রায়ের জন্য একদিকে যেমন শক্তি, তেমনি অন্যদিকে প্রত্যাশার চাপও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ডিলিমিটেশনের পর বদলে যাওয়া সমীকরণে কে এগিয়ে?
অন্যদিকে, বিজেপির প্রার্থী ডঃ মিলন দাসও কোনো অংশে কম যান না। গত নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হলেও তার ভোটব্যাঙ্ক যে দৃঢ়, তা স্পষ্ট। দলীয় সংগঠনের উপর তার দখল এবং ধারাবাহিক প্রচার কার্যক্রম তাকে আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দানে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। বিজেপি যে তাকে দ্বিতীয়বারের জন্য সুযোগ দিয়েছে, তা থেকে বোঝা যায় দল তার উপর যথেষ্ট আস্থা রাখছে।
তবে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ডিলিমিটেশন। নতুন করে প্রায় ৭৫ হাজার হিন্দু ভোটার এই কেন্দ্রে যুক্ত হওয়ার ফলে ভোটের সমীকরণে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আগে এই চা-বাগান অঞ্চলগুলি আলগাপুরের অন্তর্গত ছিল এবং সেগুলি রাহুল রায়ের প্রভাববলয়ে পড়ত। এখন সেই এলাকাগুলি হাইলাকান্দির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় কংগ্রেসের পক্ষে একটি সম্ভাবনার জানালা খুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অতিরিক্ত ভোটারদের একটি বড় অংশ যদি রাহুল রায়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনা যথেষ্ট বেড়ে যাবে। বিশেষ করে, যদি তিনি ৩০ থেকে ৪০ হাজার ভোট নিজের পক্ষে টানতে সক্ষম হন, তাহলে লড়াইয়ের রূপরেখা সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। তবে এই সমীকরণ এতটা সরল নয়। বিজেপিও এই নতুন ভোটারদের টার্গেট করে সংগঠিত প্রচার চালাচ্ছে এবং ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুকে সামনে এনে ভোট টানার চেষ্টা করছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন এআইইউডিএফ এর জাকির হোসেন লস্কর। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তার প্রভাব অনেকটাই ম্লান বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে লড়াই এখন কার্যত দুই মেরুতেই সীমাবদ্ধ কংগ্রেস বনাম বিজেপি। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, হাইলাকান্দির ভোটাররা কি অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যের উপর ভরসা রাখবেন, নাকি পরিবর্তনের বার্তা গ্রহণ করবেন? রাহুল রায়ের পক্ষে যেমন রয়েছে পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও পূর্ব অভিজ্ঞতা, তেমনি ডঃ মিলন দাসের পক্ষে রয়েছে সংগঠনের শক্ত ভিত ও পুনরায় জয়ের ক্ষুধা।
সব মিলিয়ে, হাইলাকান্দি এখন শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্র নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতীক যেখানে অতীতের প্রভাব, বর্তমানের কৌশল এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা এই তিনের সম্মিলনে নির্ধারিত হবে চূড়ান্ত ফলাফল। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই এই কেন্দ্রের উত্তাপ বাড়ছে, আর নজর থাকছে গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের।


