অসম রাজনীতিতে গেম চেঞ্জার বরদলৈ, ১৬ বছরের যাত্রার অবসান, কংগ্রেস ত্যাগ করে বিজেপিতে

অনেক না বলা কথা রয়েছে। কিন্তু আমি কখনও দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিষয় বাইরে বলিনি। আজ অসমের মানুষ জানুক কেন আমি দল ছাড়লাম। তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, তবে কোথাও যেন দীর্ঘদিনের অভিমানও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। মাত্র ১৬ বছর বয়সে কটন কলেজে পড়ার সময় ছাত্র সংগঠন এন এস ইউ আইতে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেন বরদলৈ।

সেই সময় থেকেই কংগ্রেসের আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন তিনি। জরুরি অবস্থার পর যখন ইন্দিরা গান্ধীকে ঘিরে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছিল, তখনও তিনি তাঁর পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখান। ১৯৭৮ সালে ইন্দিরা গান্ধী অসম সফরে এলে কটন কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁকে গামোছা পরিয়ে স্বাগত জানানোর ঘটনাও তিনি স্মরণ করেন। সেই ঘটনার জেরে তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছিল, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা বলে তিনি উল্লেখ করেন।

১৯৯৬ সালে মার্ঘেরিটা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস তাঁকে প্রার্থী করলেও তিনি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়িয়ে তরুণ গগৈকে সুযোগ করে দেন। পরে নিজেই সেই কেন্দ্র থেকে চারবার নির্বাচিত হয়ে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করেন। কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র দপ্তর এবং পরে বিদ্যুৎ দপ্তরের দায়িত্ব সামলান। তাঁর দাবি, তিনি সর্বদা অসমের উন্নয়ন, শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য কাজ করে গেছেন।

কংগ্রেস ছাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বরদলৈ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দলের ভেতরে ক্রমাগত উপেক্ষা এবং সন্দেহের পরিবেশই তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। তিনি জানান, কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচনে শশী থারুর এর পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করার পর তাঁকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কংগ্রেস কমিটির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। গৌরব গগৈ সভাপতি হওয়ার সময় একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানালেও বাস্তবে তাঁকে বারবার উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় নিজের দলের কর্মীদের দ্বারাই আক্রমণের শিকার হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন বরদলৈ। তিনি বলেন, বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে জানিয়েও কোনও কার্যকর প্রতিক্রিয়া পাননি। বরং তাঁর অভিযোগকে ইমরান মাসুদ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন। এই ঘটনাগুলিই তাঁর কাছে চূড়ান্ত হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বরদলৈ জানান, সংসদে বিজেপি নেতাদের সঙ্গে দেখা হলে তাঁকে একাধিকবার দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা তিনি আগে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। পদত্যাগের পর বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং দিসপুর কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে লড়ার প্রস্তাব দেয়। তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং জানান, কোনও শর্ত ছাড়াই তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন, শুধুমাত্র আত্মসম্মান বজায় রেখে কাজ করার সুযোগ চেয়েছিলেন।

অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে তিনি যোগ্য নেতা বলে উল্লেখ করেন এবং তাঁর নেতৃত্বে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নগাঁও আসনের জন্য তাঁকে নিজেই অনুরোধ করতে হয়েছে, এ কথা জানিয়ে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ২০১৯ সালে ৩৫ বছর পর ওই আসন থেকে জয়ী হলেও পরবর্তীতে গৌরব গগৈ এবং রকিবুল হুসেন সেই আসনের দাবি তোলেন, যা তাঁকে মানসিকভাবে আঘাত দেয় বলে জানান।

বরদলৈ স্পষ্ট করে বলেন, তিনি কখনও ভাষা বা ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি করেননি। মুসলিম তুষ্টিকরণ রাজনীতির সঙ্গেও তিনি নিজেকে যুক্ত করেন না বলে দাবি করেন। বরং সমাজের অবহেলিত মানুষের উন্নয়ন এবং বর অসম এর ঐক্যবদ্ধ ধারণা বজায় রাখাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। দিসপুর কেন্দ্র নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা জয়ন্ত দাস ও অতুল বরার মতো নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক।

তিনি তাঁদের সঙ্গে সংবেদনশীলভাবে আলোচনা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবেন। প্রতিদ্বন্দ্বী মীরা বরঠাকুর এর প্রসঙ্গে তিনি সৌজন্য বজায় রেখে বলেন, তিনি একজন যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কটূক্তি করবেন না।

উল্লেখযোগ্যভাবে, তাঁকে কংগ্রেসে আনার ক্ষেত্রেও বরদলৈয়ের নিজস্ব ভূমিকা ছিল বলে জানান তিনি। গৌরব গগৈ এর পাকিস্তান সংযোগ নিয়ে চলমান বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক মন্তব্য করে বলেন, যদি কিছু প্রমাণিত হয়, তাহলে আলাদা বিষয়। তবে তরুণ গগৈয়ের ছেলে এমন কিছু করবেন বলে আমি মনে করি না। নিজের ছেলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি সন্তানকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দূরে রেখে নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে উৎসাহ দিয়েছেন।

তিনি পদত্যাগ করার সময় কংগ্রেস তাঁর ছেলে প্রতীক বরদলৈকে টিকিট দেয়। ছেলেকে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত যেন সন্তানের রাজনৈতিক পথচলায় প্রভাব না ফেলে। ছেলের সিদ্ধান্তকে তিনি সম্মান করেন বলেও জানান। প্রদ্যুৎ বরদলৈয়ের এই বিস্ফোরক সাংবাদিক সম্মেলন শুধু কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকটকেই সামনে আনেনি, বরং অসমের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিতও দিয়েছে। দীর্ঘদিনের কংগ্রেস নেতা থেকে বিজেপির নতুন মুখ, এই পরিবর্তন কতটা প্রভাব ফেলবে দিসপুর তথা সমগ্র অসমের রাজনীতিতে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Related Posts

বিজেপির সঙ্গে তিন দশকের সম্পর্ক ছিন্ন, ময়দানে জয়ন্ত দাস

বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ২২ মার্চঃ অবশেষে জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিজেপি ছাড়লেন দলের প্রবীণ নেতা তথা দিছপুৰ কেন্দ্রের দীর্ঘদিনের টিকিট প্রত্যাশী জয়ন্ত কুমার দাস। টিকিট না পাওয়ার ক্ষোভে দলত্যাগ করে তিনি…

মুখ্যমন্ত্রীর হলফনামা ঘিরে নয়া বিতর্ক, স্থাবর সম্পত্তি নেই হিমন্তের, নগদ মাত্র ২ লক্ষ, ১৫ গুণ ধনী স্ত্রী!

বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ২২ মার্চঃ রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আবারও শিরোনামে উঠে এলেন তাঁর নির্বাচনী হলফনামা ঘিরে। জালুকবাড়ি কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হিসেবে জমা দেওয়া এই হলফনামায়…