ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের আগুন, ব্যারেল ১১৮ ডলার ছুঁইছুঁই

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধকে ঘিরে তেল সরবরাহ নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পশ্চিম এশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী অঞ্চল। ফলে সেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়া মানেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়া প্রায় অনিবার্য।

এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট। ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী বা আইআরজিসি হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় সেখানে শত শত তেলবাহী ট্যাঙ্কার আটকে পড়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে হরমুজে জট তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আরও বেড়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও রকেট গতিতে বৃদ্ধি পেতে পারে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে পরিবহন খরচ, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর। ইতিমধ্যেই অনেক অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে।

এদিকে তেলের দামের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান ধাতুর বাজারেও অদ্ভুত ওঠানামা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরে সকালে স্পট গোল্ডের দাম ০.৯ শতাংশ কমে ৫১২৪.৪৮ ডলারে নেমে এসেছে। একইসঙ্গে রুপোর দামও প্রতি আউন্সে প্রায় ১.৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮৩.২২ ডলারে। সাধারণত যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সোনার দাম বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের অস্থিরতার কারণে সেই স্বাভাবিক প্রবণতায় ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে।

বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতীয় শেয়ার বাজারেও। সোমবার বাজার খোলার পরই বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক সেনসেক্স প্রায় ২৪০০ পয়েন্ট পর্যন্ত নেমে যায়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় বাজারে ব্যাপক বিক্রির প্রবণতা দেখা গেছে।

তেলের বাজারে অস্থিরতা বাড়তেই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে। তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে রাশিয়া থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতকে কিছুটা ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইতিমধ্যেই যে রাশিয়ান তেল সাগরে রয়েছে, তা ভারতীয় শোধনাগারগুলি কিনতে পারে।

ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ভারতীয় শোধনাগারগুলি প্রতিদিন প্রায় ৫.৬ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব সরাসরি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর পড়তে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানিয়েছে, ভারতের মোট অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ করতে প্রস্তুত রয়েছে রাশিয়া। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলিতে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানিতে ওঠানামা দেখা গেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি কমে দৈনিক প্রায় ১.১ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছিল, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে আবার সেই আমদানির হার প্রায় ৩০ শতাংশে ফিরে এসেছে বলে জানা গেছে।

ভারতের একাধিক তেল শোধনাগারের সূত্র জানিয়েছে, রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল বিক্রি করা আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ভারতীয় রিফাইনারিগুলি নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তবে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত সরকারের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবস্থানের ওপরই নির্ভর করবে।

কারণ এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনা এখনও চলমান। এর আগেই মার্কিন রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেছিলেন, ভারত যদি রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা আরও বাড়ায়, তাহলে ভারতের ওপর নতুন করে শুল্ক চাপানো হতে পারে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের সেই শুল্ক নীতিকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের দামে নতুন করে আগুন লাগার আশঙ্কা দেখা দিতেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ভারতের মতো বড় ক্রেতা দেশগুলির ভূমিকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এরই মধ্যে রাশিয়াও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা ভারতে তেল সরবরাহ করতে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় জলসীমার দিকে ইতিমধ্যেই প্রায় ৯.৫ মিলিয়ন ব্যারেল রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল বহনকারী জাহাজ এগিয়ে আসছে। এর অনেকগুলিই অ-রাশিয়ান জাহাজে পরিবাহিত হচ্ছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা ভারতীয় বন্দরে পৌঁছাতে পারে।

এদিকে দেশের অভ্যন্তরেও জ্বালানি বাজার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইতিমধ্যেই রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে আপাতত পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়ানো হবে না।

সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সংঘাত হিসেবেই সীমাবদ্ধ নেই। তার ঢেউ এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল সমীকরণে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখন নির্ভর করছে যুদ্ধ পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতির ওপর। তবে একথা স্পষ্ট—হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী।

Related Posts

ইরান যুদ্ধের ছায়ায় কাঁপছে ভারতীয় শেয়ার বাজার: ১০ দিনে উধাও ৩১ লাখ কোটি টাকা

ওয়েবডেস্ক, বারাকবাণী, ৯ মার্চঃ বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব যে অর্থনীতির ওপর কতটা গভীরভাবে পড়তে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখা গেল সোমবার ভারতের শেয়ার বাজারে। ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির…