ওয়েবডেস্ক, বারাকবাণী, ৯ মার্চঃ বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব যে অর্থনীতির ওপর কতটা গভীরভাবে পড়তে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখা গেল সোমবার ভারতের শেয়ার বাজারে। ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির আবহে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় এক ধাক্কায় বড় পতনের মুখে পড়ে ভারতের দুই প্রধান সূচক সেনসেক্স ও নিফটি। বাজার খোলার পর থেকেই বিক্রির চাপে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েন বিনিয়োগকারীরা।
সেনসেক্স একসময় ৭৬,৫০০-এর নিচে, নিফটি ২৩,৭০০ ভাঙল; বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কে বিক্রির হিড়িক
সোমবার লেনদেন শুরু হতেই বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক সেনসেক্স প্রায় ২৪০০ পয়েন্ট পর্যন্ত নেমে যায়। দিনের এক পর্যায়ে সেনসেক্স ৭৬,৫০০ পয়েন্টের নিচে চলে যায়। একই সঙ্গে নিফটি৫০ সূচকও ২৩,৭০০ পয়েন্টের নিচে নেমে গিয়ে বাজারে উদ্বেগের পরিবেশ আরও তীব্র করে তোলে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে এটি অন্যতম বড় পতন, যা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে ব্যাংকিং ও অবকাঠামো খাতের শেয়ার। বিশেষ করে দেশের শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংক এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক, আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক এবং সরকারি ব্যাংক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার শেয়ারে উল্লেখযোগ্য পতন লক্ষ্য করা গেছে। পাশাপাশি অবকাঠামো সংস্থা লারসেন অ্যান্ড টুব্রোর শেয়ারেও বড়সড় পতন হয়েছে। এই চারটি বৃহৎ সংস্থার শেয়ার পতন সূচকের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইরানকে কেন্দ্র করে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব আরও গভীর হতে পারে—এই আশঙ্কাতেই বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলস্বরূপ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভারতীয় বাজারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
একদিনেই উধাও ১২ লাখ কোটি টাকা, ব্যাংকিং ও অবকাঠামো খাতে বড় ধাক্কা
পরিসংখ্যান বলছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের মোট বাজারমূল্য বা মার্কেট ক্যাপিটাল ছিল প্রায় ৪৬৩ লাখ কোটি টাকা। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে ধস নামতে শুরু করে। গত ৬ মার্চ সেই বাজারমূল্য নেমে আসে প্রায় ৪৪৪ লাখ কোটি টাকায়। আর সোমবারের পতনের পর তা আরও কমে দাঁড়ায় ৪৩২ লাখ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দশ দিনের মধ্যে ভারতীয় শেয়ার বাজার থেকে প্রায় ৩১ লাখ কোটি টাকা উধাও হয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধু সোমবারই বাজার থেকে প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকা উধাও হয়েছে বলে জানা গেছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি এক বড় ধাক্কা। অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী তাদের পোর্টফোলিওতে বড়সড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেনসেক্সে প্রায় ২৪০০ পয়েন্ট পতন, বিনিয়োগকারীদের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি
বিশ্ববাজারের পরিস্থিতিও এই অস্থিরতার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি ১১৮.৭৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২০ সালের এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দামও প্রায় ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের মুদ্রা বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। ডলারের তুলনায় ভারতীয় রুপির দাম আরও কমেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয় বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন বলেও মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সাধারণত যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার দাম বাড়তে দেখা গেলেও গত কয়েকদিনে সেখানে কিছুটা অস্বাভাবিক প্রবণতা দেখা গেছে। সিঙ্গাপুরের বাজারে স্পট গোল্ডের দাম ০.৯ শতাংশ কমে ৫১২৪.৪৮ ডলারে নেমে এসেছে। রুপোর দামও প্রতি আউন্সে প্রায় ১.৬ শতাংশ কমে ৮৩.২২ ডলারে পৌঁছেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তার বহুমাত্রিক প্রভাব পড়তে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে এক ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। যার প্রভাব থেকে ভারতও সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। তবে অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করছেন, বাজারে এই ধস মূলত আতঙ্কের প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধীরে ধীরে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধের ছায়া এখন শুধু কূটনীতি বা সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; তার সরাসরি অভিঘাত পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। আর সেই অভিঘাতের ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে ভারতীয় শেয়ার বাজারেও। বিনিয়োগকারীরা এখন তাকিয়ে আছেন বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে যুদ্ধ থামবে, না কি অস্থিরতা আরও বাড়বে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বাজারের গতিপথ।

