বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৫ মেঃ দেশজুড়ে নির্বাচনী তালিকা শুদ্ধিকরণে আরও এক বড় পদক্ষেপ নিতে চলেছে ভারত নির্বাচন কমিশন। আগামী ২০ মে থেকে ফের শুরু হচ্ছে বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়া। বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, দেশের ১৬টি রাজ্য এবং তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পর্যায়ক্রমে এই কর্মসূচি চালানো হবে। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এবার উত্তর-পূর্ব ভারতের পাঁচটি রাজ্যও এই প্রক্রিয়ার আওতায় এসেছে। ফলে ভোটার তালিকা বিশুদ্ধকরণ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিতে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় জানানো হয়েছে, ওড়িশা, মিজোরাম, মণিপুর, সিকিম, উত্তরাখণ্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, হরিয়ানা, চণ্ডীগড়, তেলেঙ্গানা, পাঞ্জাব, কর্ণাটক, মেঘালয়, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, দিল্লি, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরায় এই এসআইআর প্রক্রিয়া কার্যকর হবে। এর মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য হিসেবে মিজোরাম, মণিপুর, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরার অন্তর্ভুক্তি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
৩৬ কোটিরও বেশি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ে মাঠে নামছে লক্ষাধিক কর্মী, উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিও অন্তর্ভুক্ত
তবে হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখে এখনও এসআইআর-এর দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়নি। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ওইসব অঞ্চলে বর্তমানে জনগণনার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ এবং আবহাওয়াজনিত প্রতিকূলতা বিবেচনায় রেখেই পরবর্তীতে আলাদা করে সময়সূচি প্রকাশ করা হবে। বিশেষ করে তুষারাবৃত ও দুর্গম পার্বত্য এলাকায় বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশজুড়ে চলমান জনগণনার পারিবারিক তালিকাভুক্তি এবং ক্ষেত্রভিত্তিক প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এসআইআরের তৃতীয় পর্যায়ের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। কমিশনের দাবি, এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হল নির্বাচনী তালিকাকে আরও নির্ভুল ও স্বচ্ছ করে তোলা, যাতে শুধুমাত্র যোগ্য নাগরিকদের নাম ভোটার তালিকায় থাকে এবং কোনও অযোগ্য বা ভুয়ো নাম অন্তর্ভুক্ত না হয়।
এই প্রসঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বলেন, এসআইআরের মাধ্যমে গোটা দেশের নির্বাচনী তালিকা আরও শক্তিশালী ও নির্ভুল হবে। আমরা চাই, প্রত্যেক যোগ্য ভোটার এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করুন। গণনা ফর্ম পূরণ থেকে শুরু করে তথ্য যাচাই সব ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্যই হল সঠিক ভোটারকে তালিকাভুক্ত করা এবং ভুল বা অযোগ্য নাম বাদ দেওয়া।
নির্বাচন কমিশনের তরফে আরও জানানো হয়েছে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য ইতিমধ্যেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এসআইআরের তৃতীয় পর্যায়ে প্রায় ৩.৯৪ লক্ষ বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) মাঠে নামবেন। তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করবেন। এই কাজে তাঁদের সহায়তা করবেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রায় ৩.৪২ লক্ষ বুথ লেভেল এজেন্ট (বিএলএ)। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৩৬.৭৩ কোটি ভোটারের কাছে পৌঁছনোর লক্ষ্য নিয়েই এই বৃহৎ অভিযান পরিচালিত হবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এসআইআর শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও মজবুত করার অন্যতম বড় উদ্যোগ। সেই কারণেই নির্বাচন কমিশন সমস্ত রাজনৈতিক দলকে প্রতিটি বুথে বিএলএ নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে গোটা প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হয় এবং কোনও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ না ওঠে। কমিশন আরও স্পষ্ট করেছে, ভোটার, রাজনৈতিক দল, নির্বাচনী আধিকারিক এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এত বৃহৎ কর্মসূচি সফল করা সম্ভব নয়।
তাই প্রতিটি স্তরে সমন্বয় বজায় রেখে এসআইআর পরিচালনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এর আগের দুই পর্যায়ে দেশের ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে প্রায় ৫৯ কোটি ভোটারকে এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছিল। সেই সময় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নিযুক্ত ৬.৩ লক্ষেরও বেশি বিএলও এবং রাজনৈতিক দলগুলির ৯.২ লক্ষের বেশি বিএলএ বিভিন্ন ধাপে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছিলেন।
কমিশনের দাবি, আগের পর্যায়গুলিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তথ্য সংশোধন, মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া এবং নতুন যোগ্য ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্ত করার কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী দিনে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা বিশুদ্ধকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের এই নতুন উদ্যোগ একদিকে যেমন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, তেমনই নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও আরও বাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।








