বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৫ মেঃ শিলচরে সাম্প্রতিক ‘মরাল পুলিশিং’এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্যের মধ্যেই অবশেষে আত্মসমর্পণ করলেন অভিযুক্ত যুবক রাজবীর লস্কর। বুধবার সন্ধ্যা রাতে শিলচর সদর থানায় উপস্থিত হয়ে তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাঁকে থানায় নিয়ে যান তাঁর বাবা কমরুল ইসলাম লস্কর নিজেই। পরে ছেলেকে সরাসরি শিলচর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক (ওসি) উত্তম অধিকারীর হাতে তুলে দেন তিনি।
ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই সামাজিক ও নাগরিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ, রাজবীর লস্কর সহ কয়েকজন যুবক মিলে এক যুবককে মারধর করে এবং সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, কে দিল সাধারণ মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার?
আইনের প্রতি আস্থা রেখেই ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন বাবা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সমাজের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে তথাকথিত ‘মরাল পুলিশিং’এর প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক, বন্ধুত্ব কিংবা চলাফেরা নিয়ে কিছু মানুষ নিজেদের বিচারক ভেবে অন্যদের হেনস্থা করছে। শুধু তাই নয়, সেই ঘটনাকে ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে অপমান ও ভয় প্রদর্শনের এক অসুস্থ সংস্কৃতিও গড়ে উঠছে।
সচেতন মহলের মতে, এটি শুধু আইনবিরোধী নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ ও নাগরিক স্বাধীনতার পরিপন্থী। এদিন থানার বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কমরুল ইসলাম লস্কর অত্যন্ত সংযত ভাষায় বলেন, আমার আইনের উপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। আইন সবার জন্য সমান। তদন্তের মাধ্যমে সত্য সামনে আসবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে বলেই আমি বিশ্বাস করি।
তিনি জানান, প্রায় এক সপ্তাহ আগে তিনি পুরো বিষয়টি জানতে পারেন এবং ঘটনাটি শুনে গভীরভাবে ব্যথিত হন। তাঁর কথায়, আমার ছেলে দোষী কিনা, তা তদন্তেই প্রমাণিত হবে। যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। নিজের ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে কমরুল ইসলাম বলেন, আমি চাই না কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকুক। তাই নিজেই ছেলেকে থানায় নিয়ে এসেছি।
ঘটনার পেছনে আরও কিছু তথ্য বা অন্য কোনও দিক আছে কিনা, সেটাও তদন্তে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। এদিকে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বহু মানুষ এই ধরনের মরাল পুলিশিংয়ের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়ার দাবি তুলেছেন। তাঁদের মতে, কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়ে কাউকে শাস্তি দিতে পারে না। দেশে আইন, আদালত ও প্রশাসন রয়েছে , বিচার করার দায়িত্ব তাঁদেরই।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশও মনে করছেন, এই ধরনের ঘটনা সমাজে ভয় ও অরাজকতার পরিবেশ তৈরি করে। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে অসহিষ্ণুতা ও গোষ্ঠীগত দাদাগিরির মানসিকতা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ফলে প্রশাসনের উচিত নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বর্তমানে পুলিশ পুরো ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
ঘটনায় আরও কারা জড়িত, ভিডিওটি কীভাবে ছড়ানো হলো এবং এর পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। শিলচরের এই ঘটনা আবারও স্পষ্ট করে দিল, সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। আর সেই কারণেই সচেতন নাগরিক সমাজ এখন একটাই দাবি তুলছে, বিচার হোক আইনের পথে, রাস্তায় নয়।





