বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৫ মেঃ হাইলাকান্দি শহরের অদূরবর্তী নিশ্চিন্তপুর প্রথম খন্ড এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা তীব্র পানীয় জলের সংকট এখন চরম মানবিক দুর্ভোগের রূপ নিয়েছে। সরকারি জল প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও মাসের পর মাস পর্যাপ্ত পানীয় জল না পাওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন এলাকার শতাধিক পরিবার। অবশেষে বৃহস্পতিবার সকালে এলাকার মহিলারা কলসি, বালতি ও পানির পাত্র হাতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
জল নাই, জল চাই, আমাদের দাবি মানতে হবে, পিএইচই বিভাগ হায় হায় এইসব স্লোগানে গোটা নিশ্চিন্তপুর এলাকা উত্তাল হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত প্রায় ছয় মাস ধরে নিশ্চিন্তপুর প্রথম খন্ড এলাকায় পিএইচই বিভাগের জল সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
কখনও সপ্তাহের পর সপ্তাহ জল আসে না, আবার কখনও সরবরাহ হলেও সেই জল এতটাই নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত থাকে যে তা ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ প্রতি মাসে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত জল বিল নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক গৃহবধূ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই প্রথম চিন্তা হয় আজ জল পাব কি না। রান্না, কাপড় কাচা, বাসন মাজা, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো সবকিছুই জলের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু দিনের পর দিন আমরা জল ছাড়া জীবন কাটাচ্ছি।
এত অভিযোগ করেও কোনও লাভ হচ্ছে না। অন্য এক মহিলা বলেন, সরকার বলে ‘ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানীয় জল, কিন্তু আমাদের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। কখনও সাতদিন পর্যন্ত একফোঁটা জল আসে না। বাধ্য হয়ে নালা-নর্দমার পাশের পুকুর থেকে জল আনতে হচ্ছে। এতে রোগব্যাধির আশঙ্কাও বাড়ছে।
এলাকাবাসীর বক্তব্য অনুযায়ী, নিশ্চিন্তপুরের বহু পরিবার এখন চরম অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর উৎসের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কেউ দূরের টিউবওয়েল থেকে জল টেনে আনছেন, আবার কেউ প্রতিবেশীর বাড়ির উপর নির্ভর করছেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে জল বহন করতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। স্থানীয় প্রবীণদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে বারবার পিএইচই বিভাগে জানানো হলেও কোনও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মাঝে মধ্যে পাইপলাইনের সাময়িক মেরামতি করা হলেও কয়েকদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় পরিস্থিতি। ফলে ক্ষোভ ধীরে ধীরে জনরোষে পরিণত হচ্ছে।
বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, শুধুমাত্র অব্যবস্থাপনা নয়, জল প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণে চরম গাফিলতি এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণেই আজ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে জল প্রকল্প নির্মাণ হলেও সাধারণ মানুষ তার কোনও সুফল পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রশ্ন উঠছে, যেখানে নিয়মিত বিল আদায় হচ্ছে, সেখানে কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না ন্যূনতম পরিষেবা? স্থানীয়দের মতে, এই সংকট শুধু জল সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন জনস্বাস্থ্য সংকটের আকার ধারণ করছে। নোংরা ও অপরিষ্কার জল ব্যবহারের ফলে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে বিভিন্ন পেটের রোগ, চর্মরোগ এবং জ্বরের প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অথচ প্রশাসনের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনও জরুরি বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
এদিকে, সমস্যার দ্রুত সমাধানের দাবিতে পিএইচই বিভাগের পাশাপাশি হাইলাকান্দির নবনির্বাচিত বিধায়ক ডা. মিলন দাসের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এলাকাবাসী। তাদের বক্তব্য, নির্বাচনের সময় সাধারণ মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে এখনও পর্যন্ত জল সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
নতুন বিধায়ক দ্রুত এলাকায় পরিদর্শনে এসে বাস্তব পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেই আশা প্রকাশ করেছেন বিক্ষোভকারীরা। বৃহস্পতিবারের এই বিক্ষোভের মাধ্যমে নিশ্চিন্তপুরের মানুষ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, আর আশ্বাস নয়, এবার তারা স্থায়ী সমাধান চান। কারণ বিশুদ্ধ পানীয় জল কোনও বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভই এখন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে নিয়েছে।





