সোনাই থানায় পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের বিস্ফোরক অভিযোগে চাঞ্চল্য জেলাজুড়ে

প্রশ্ন উঠছে, যদি থানার ভেতরেই একজন অভিযুক্ত নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপত্তা খুঁজবেন? ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, সোনাই থানার একটি মামলার সূত্র ধরে গত ১১ মে গভীর রাতে গুয়াহাটি থেকে আটক করা হয় সাহারুল ইসলাম লস্করকে। এরপর ১৩ মে ভোররাতে তাঁকে সোনাই থানায় নিয়ে আসা হয়। পরিবারের সদস্যরাও সেই সময় থানার বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু অভিযোগ, রাত প্রায় ২টার দিকে পুলিশ তাঁদের সেখান থেকে চলে যেতে বলে। আর এরপরই ঘটে যায় ভয়ংকর ঘটনা।

সাহারুল ইসলাম লস্করের স্ত্রী মাখন বেগম লস্কর লিখিত অভিযোগে দাবি করেছেন, থানার ভেতরে পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থাতেই তাঁর স্বামীর উপর চালানো হয় বর্বর অত্যাচার। আদালতে তোলার পর আহত অবস্থায় সাহারুল তাঁর স্ত্রীকে জানান, পাঁচজন ব্যক্তি মিলে তাঁকে মারধর করে। শুধু তাই নয়, সেই সময় নাকি দুই পুলিশকর্মী তাঁর হাত চেপে ধরে রেখেছিলেন, যাতে তিনি আত্মরক্ষা পর্যন্ত করতে না পারেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ঘটনায় যাদের নাম উঠে এসেছে তারা শুধুমাত্র সাধারণ ব্যক্তি নন।

অভিযোগে নাম রয়েছে সোনাই মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বিজেপি কর্মী সাহারুল আলম শেখের। পাশাপাশি ইমরাউল শেখ, কালাম উদ্দিন, ফরিশ উদ্দিন এবং রফিক উদ্দিনের নামও উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারী। পরিবারের দাবি, এরা সকলেই সোনাইয়ের উত্তর মোহনপুর এলাকার বাসিন্দা এবং পুলিশি সহযোগিতাতেই থানার ভেতরে প্রবেশ করে সাহারুল ইসলাম লস্করের উপর হামলা চালায়।

এখানেই শেষ নয়। ঘটনায় সরাসরি সোনাই থানার ওসি ত্রিদীপ কুমার বরা এবং তদন্তকারী অফিসার এসআই জয়ন্ত দেবের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। অভিযোগ, তাঁদের উপস্থিতি ও প্রত্যক্ষ মদতেই থানার ভেতরে এই মারধরের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এমনকি অভিযুক্তদের মধ্যে একজন নাকি সেই সময় ফেসবুক লাইভও করেছিলেন বলে দাবি পরিবারের। যদি এই অভিযোগ সত্যি হয়, তাহলে তা আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। কারণ, থানার মতো সংরক্ষিত এলাকায় সাধারণ মানুষ কীভাবে অবাধে প্রবেশ করল? কে দিল সেই অনুমতি? আর একজন আটক ব্যক্তির উপর প্রকাশ্যে হামলা চালানোর সাহসই বা তারা পেল কোথা থেকে?

এই ঘটনাকে ঘিরে এখন জনমনে একের পর এক গুরুতর প্রশ্ন দানা বাঁধছে। পুলিশ হেফাজতে থাকা একজন ব্যক্তির নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব যেখানে পুলিশের, সেখানে থানার ভেতরেই কীভাবে এমন অভিযোগ উঠল? সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে, থানার মতো সংরক্ষিত এলাকায় বাইরের লোকজন প্রবেশের অনুমতি পেল কীভাবে?

যদি সত্যিই পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারধরের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সেই সময় কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা কী ভূমিকা পালন করছিলেন? তাঁরা কি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন, নাকি অভিযোগ অনুযায়ী পুরো ঘটনাই ঘটেছে তাঁদের নীরব সম্মতি অথবা প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়? সব মিলিয়ে ঘটনাটি শুধু একটি নির্যাতনের অভিযোগ নয়, বরং থানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পুলিশি ভূমিকা এবং আইন রক্ষাকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পুলিশ হেফাজতে কোনও ব্যক্তির উপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। দেশের আইন অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি একজন নাগরিক, এবং তাঁর মৌলিক অধিকার রক্ষা করা পুলিশের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন থানাকে ঘিরে যেভাবে হেফাজতে নির্যাতন, মৃত্যুর অভিযোগ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ সামনে আসছে, তাতে সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমশ প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, থানাগুলো ধীরে ধীরে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের জায়গা থেকে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে ভয় ও অনাস্থা বাড়ছে। সোনাই থানার এই অভিযোগ সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করেছে বলে মত অনেকের।

এদিকে, মাখন বেগম লস্কর পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। পাশাপাশি তিনি সোনাই থানার সিসিটিভি ফুটেজ এবং আশপাশের পৌরসভার সিসিটিভি ফুটেজ অবিলম্বে সংরক্ষণের আবেদন জানিয়েছেন, যাতে কোনও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট না হয়ে যায় এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য সামনে আসে। পরিবারের আশঙ্কা, সময় গড়ালে প্রমাণ লোপাটের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশও বিষয়টির উপর নজর রাখছে বলে জানা গেছে। তাঁদের মতে, যদি থানার ভেতরে বাইরের লোকজন ঢুকে একজন অভিযুক্তকে মারধর করে থাকে, তবে তা শুধুমাত্র আইনভঙ্গ নয়, বরং গোটা পুলিশি ব্যবস্থার উপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে। ঘটনার পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। চায়ের দোকান থেকে বাজার, সামাজিক মাধ্যম থেকে রাজনৈতিক মহল সর্বত্র এখন একটাই আলোচনা, থানার ভেতরেও যদি নিরাপত্তা না থাকে, তবে মানুষ কোথায় যাবে?

তবে এতসব গুরুতর অভিযোগ উঠলেও, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পুলিশের নীরবতা ঘিরেও তৈরি হয়েছে নতুন জল্পনা। এখন দেখার, প্রশাসন এই অভিযোগকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং আদৌ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য সামনে আনার উদ্যোগ নেয় কি না।

Related Posts

টানা বর্ষণে জলমগ্ন উধারবন্দ, বাড়ছে মধুরা নদীর জলস্তর, বন্যার আশঙ্কায় আতঙ্কিত নদীপাড়ের মানুষ

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ মেঃ টানা কয়েক ঘণ্টার অবিরাম বর্ষণে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উধারবন্দের স্বাভাবিক জনজীবন। শুক্রবার ভোর রাত থেকে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টিতে শহর ও শহরতলির একাধিক এলাকা…

অবিরাম বর্ষণে পাঁচগ্রাম মিরাপিং মোকামের সড়কে ধস, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ, ব্যাহত যান চলাচল

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ মেঃ টানা কয়েক ঘণ্টার অবিরাম বর্ষণে ফের বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পাঁচগ্রাম এলাকার জনজীবন। ভারী বৃষ্টিপাতের জেরে এবার ধস নামল পাঁচগ্রামের মিরাপিং মোকাম সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে। হঠাৎ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *