বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ মেঃ ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির চাপে জর্জরিত সাধারণ মানুষের মাথায় ফের নতুন বোঝা চাপাল পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি। দেশের অন্যান্য প্রান্তের পাশাপাশি অসমেও শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে জ্বালানির নতুন মূল্য। গুয়াহাটি সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ইন্ডিয়ান অয়েল পাম্পে পেট্রোলের দাম পৌঁছেছে প্রতি লিটারে ১০১.২০ টাকা এবং ডিজেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৯২.৪৯ টাকায়।
এক ধাক্কায় পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৩.০১ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৩.০৭ টাকা বেড়ে যাওয়ায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের অস্থিরতার অজুহাত দেখিয়ে তেল কোম্পানিগুলি আবারও মূল্যবৃদ্ধির পথে হাঁটল।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই যদি দেশের সাধারণ মানুষের ঘাড়ে সেই বোঝা চাপানো হয়, তাহলে কর কমিয়ে বা বিকল্প নীতি গ্রহণ করে মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার উদ্যোগ কোথায়? ইতিমধ্যেই লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস উঠেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের। তার উপর জ্বালানির এই নতুন ধাক্কা যেন সাধারণ মানুষের জীবনযুদ্ধকে আরও কঠিন করে তুলল।
পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে পরিবহন খরচের উপর। আর পরিবহন ব্যয় বাড়া মানেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়া। চাল, ডাল, সবজি, মাছ, দুধ থেকে শুরু করে নির্মাণসামগ্রী সবকিছুর দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এমন এক চক্র তৈরি করে যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এদিকে মূল্যবৃদ্ধির পর থেকেই পাম্পগুলিতে জ্বালানি বিক্রির পরিমাণও কমতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। দিসপুরের একটি ইন্ডিয়ান অয়েল পাম্পের এক অফিস ম্যানেজার জানান, গতকালের তুলনায় প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ৩.০১ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৩.০৭ টাকা বেড়েছে। দাম বাড়ার ফলে বিক্রির পরিমাণও কিছুটা কমেছে। অনেকেই এখন কম পরিমাণে তেল নিচ্ছেন।
শহরের বিভিন্ন পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের মুখে একটাই কথা আর কত? এক মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, প্রতিদিনই বাজারে নতুন করে দাম বাড়ছে। তার উপর পেট্রোল-ডিজেলের এই মূল্যবৃদ্ধি আমাদের মতো মানুষের জন্য মারাত্মক সমস্যা। অফিস যাতায়াত, সংসারের খরচ সব মিলিয়ে জীবন চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। জ্বালানির দাম বাড়লে অন্য সবকিছুর দামও বাড়বে, এটা নিশ্চিত।
আরও এক গ্রাহক অবশ্য সরকারের প্রতি আস্থা রেখে বলেন, তৃতীয়বারের জন্য বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। আমরা আশা করি সরকার নিশ্চয়ই পরিস্থিতি সামাল দেবে এবং ভবিষ্যতে দাম কমানোর দিকেও নজর দেবে। যদিও এই আশাবাদের বিপরীতে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষের স্বস্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে কেন বারবার মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে জনগণকে?
আবার একাংশের মত ভিন্ন। এক গ্রাহক সরকারের পক্ষে সওয়াল করে বলেন, উন্নয়নের জন্য অর্থের প্রয়োজন। সরকার ভালো কাজ করছে। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে কিছু মূল্যবৃদ্ধি মেনে নিতেই হবে। তবে এই বক্তব্য ঘিরেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, উন্নয়নের বোঝা যদি সবসময় সাধারণ মানুষের কাঁধেই চাপানো হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল আদৌ কারা পাচ্ছে? সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন পরিবহন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন।
এক অটোরিকশা চালক ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, পেট্রোলের দাম বাড়লে আমাদের আয় কার্যত কমে যায়। ভাড়া বাড়াতে গেলে যাত্রীরা ঝগড়া করেন, আবার পুরনো ভাড়ায় চললে সংসার চালানো যায় না। প্রতিদিনের আয় থেকে তেলের খরচই এখন বড় অংশ কেটে নিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, শুধু জ্বালানির দাম নয়, বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়ছে। আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।
সামাজিক মহলের একাংশের অভিযোগ, সরকার ও তেল কোম্পানিগুলি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বাস্তব চিত্র থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত দেখিয়ে বারবার জ্বালানির দাম বাড়ানো হলেও কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা বা জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র চর্চা।
বিরোধীদের দাবি, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তাঁদের অভিযোগ, একদিকে বেকারত্ব ও আর্থিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে, অন্যদিকে লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। বর্তমানে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এই মূল্যবৃদ্ধি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আগামী দিনে বাজারে আরও বড় মূল্যবৃদ্ধির ঢেউ আছড়ে পড়বে।
বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির পক্ষে সংসারের খরচ সামলানো আরও কঠিন হয়ে উঠবে। সব মিলিয়ে পেট্রোল ও ডিজেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধি এখন শুধু অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, তা সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। আর সেই কারণেই প্রশ্ন উঠছে, এই লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির দৌড়ে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফিরবে কবে?






