বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৬ মেঃ বিকশিত অসম গড়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে দ্বিতীয় দফার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রশাসনিক তৎপরতায় নতুন বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। বৃহস্পতিবার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর শুক্রবার প্রায় ছয় ঘণ্টাব্যাপী ম্যারাথন বৈঠকে তিনটি প্রধান বিভাগের কাজকর্ম খতিয়ে দেখে একের পর এক কড়া নির্দেশনা দেন তিনি। খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে কৃষকের ধান ক্রয়, আর্থিক পরিকল্পনা, রাস্তা-সেতু নির্মাণ সর্বত্রই দ্রুততা, স্বচ্ছতা ও গুণগত মান বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
রাস্তা-সেতু নির্মাণ দ্রুত সম্পন্নের নির্দেশ “বিকশিত অসম” গড়তে টানা বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা
দ্বিতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করার পর থেকেই প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে পূর্ণোদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের তৃতীয় দফার শাসনকাল শুরু হতেই “বিকশিত অসম” গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে রাজ্যের উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিকে নতুন গতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তারই স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেল গত দু’দিনের ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে।
শুক্রবার প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে খাদ্য, জনবণ্টন ও উপভোক্তা বিষয়ক বিভাগ, অর্থ বিভাগ এবং লোকনির্মাণ (পথ) বিভাগের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে পৃথক পৃথক বৈঠকে অংশ নেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রতিটি বৈঠকেই তিনি শুধু প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করেননি, বরং বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী নির্দেশনা দিয়ে প্রশাসনিক সক্রিয়তারও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।
খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও গতি আনার নির্দেশ
দিনের প্রথম ভাগে খাদ্য, জনবণ্টন ও উপভোক্তা বিষয়ক বিভাগের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যসামগ্রীর সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করার ওপর জোর দেন। সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী যাতে কোনওভাবেই সংকটে না পড়ে, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে বিভাগীয় আধিকারিকদের কড়া নির্দেশ দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, খাদ্য বণ্টন ব্যবস্থায় দুর্নীতি বা অনিয়মের কোনও জায়গা থাকবে না। সেই লক্ষ্যেই উপভোক্তাদের আধার সংযুক্তিকরণ এবং e-KYC প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের মতে, এর ফলে প্রকৃত হিতাধিকারীদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং খাদ্যশস্য বণ্টনে স্বচ্ছতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
শুধু তাই নয়, ডাল, চিনি ও লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর বণ্টন ব্যবস্থাকেও আরও গতিশীল ও কার্যকর করে তুলতে বলা হয়েছে। খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
কৃষকদের স্বার্থে ধান ক্রয়ে বিশেষ গুরুত্ব
বৈঠকে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের বর্তমান পরিস্থিতিও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, কৃষকরাই রাজ্যের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি এবং তাঁদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।কৃষকদের ধান বিক্রির প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও ঝামেলামুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কোনও কৃষক যেন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সমস্যায় না পড়েন।
ধান ক্রয়ের ক্ষেত্রে দ্রুত অর্থপ্রদান নিশ্চিত করা এবং সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দেন যে, “অসমের অন্নদাতাদের পরিশ্রমের মর্যাদা দিতেই হবে।” সেই কারণে এ বছরও ধান ক্রয় প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে।
বাজেটের আগে আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা
অন্যদিকে, অর্থ বিভাগের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকারের মুখ্য প্রকল্পগুলির আর্থিক অগ্রগতি, রাজ্যের রাজস্ব পরিস্থিতি এবং আগামী বাজেট অধিবেশনকে সামনে রেখে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।সরকারি সূত্রে জানা গেছে, জনসাধারণকে দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির জন্য কীভাবে আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখা হবে, সে বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। বিশেষত অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলির বাস্তবায়নে কোনওরকম শৈথিল্য বরদাস্ত করা হবে না। প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
রাস্তা-সেতু নির্মাণে দ্রুততার নির্দেশ
লোকনির্মাণ (পথ) বিভাগের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও উন্নয়ন ও পরিকাঠামোকে বিশেষ গুরুত্ব দেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান রাস্তা ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পগুলির অগ্রগতি পর্যালোচনা করে তিনি দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন।বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা, অসমমালা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ প্রকল্পগুলির কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত উন্নত সড়ক যোগাযোগ পৌঁছে দেওয়াই সরকারের অগ্রাধিকার। তিনি আধিকারিকদের উদ্দেশে স্পষ্টভাবে বলেন, শুধু কাজ দ্রুত শেষ করলেই হবে না, নির্মাণের গুণগত মানও বজায় রাখতে হবে। নিম্নমানের কাজের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ারও ইঙ্গিত দেন তিনি।
প্রশাসনে গতি আনতেই ধারাবাহিক বৈঠক
উল্লেখযোগ্যভাবে, বৃহস্পতিবারও মুখ্যমন্ত্রী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। রাজ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে তিনটি প্রধান বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন তিনি। এছাড়াও বহু প্রতীক্ষিত মা কামাখ্যা করিডর প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। ধর্মীয় পর্যটন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই প্রকল্পকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার।
অন্যদিকে “অ্যাডভান্টেজ অসম ২.০” বিনিয়োগ সম্মেলনকে কেন্দ্র করেও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাজ্যে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার যে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, সেই বার্তাও উঠে এসেছে এই বৈঠক থেকে।
“জনতার আস্থার মর্যাদা রক্ষা করাই সরকারের লক্ষ্য”
পরপর বৈঠকের শেষে মুখ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, এনডিএ ৩.০ সরকারের এই নতুন অধ্যায়ে সমস্ত সরকারি বিভাগ সমন্বয়ের মাধ্যমে আরও দ্রুততার সঙ্গে কাজ করবে। তিনি বলেন, জনগণ সরকারের উপর যে আস্থা রেখেছেন, তা বাস্তব উন্নয়নের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। রাজনৈতিক মহলের মতে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর ধারাবাহিক প্রশাসনিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, আগামী দিনগুলিতে উন্নয়ন, পরিকাঠামো এবং জনমুখী প্রশাসনকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চলেছে অসম সরকার।






