বরাকে এন এইচ আই ডি সি এল-এর অধীনে নির্মাণ প্রকল্পের জাতীয় সড়ক কি দুর্নীতির আতুরঘরে পরিণত!

কোথাও রাস্তার পিচ উঠে বড় বড় গর্ত, কোথাও সামান্য বৃষ্টিতেই জলমগ্ন সড়ক, আবার কোথাও নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই রাস্তা ভেঙে পড়ার অভিযোগ উঠছে। ফলে প্রতিদিন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, যাত্রী, ব্যবসায়ী ও রোগীবাহী যানবাহন। অভিযোগের তীর সরাসরি জাতীয় সড়ক পরিকাঠামো উন্নয়ন নিগম বা এন এইচ আই ডি সি এল-এর অধীনে কাজ করা বহিঃরাজ্যের একাধিক নির্মাণ সংস্থার বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, কাজের গাফিলতি, সঠিক তদারকির অভাব এবং পরিকল্পনাহীন কাজের কারণেই অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তার এই করুণ পরিণতি হয়েছে।

বরাকবাসীর প্রশ্ন, যদি কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও টেকসই রাস্তা নির্মাণ সম্ভব না হয়, তাহলে সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে? কেন বারবার একই সড়ক মেরামতের নামে নতুন করে সরকারি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে? জনগণের করের টাকা কি শুধুই কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদার ও দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের পকেট ভরানোর হাতিয়ার হয়ে উঠছে?  সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, জাতীয় সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

বর্ষার শুরুতেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। অনেক জায়গায় রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার কারণে যান চলাচল কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ যানজট, যানবাহনের ক্ষতি এবং যাত্রীদের চরম ভোগান্তি এখন নিত্যদিনের ছবি। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু দায়সারা মেরামত নয়, বরং গোটা নির্মাণ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

কোন সংস্থা কী মানের কাজ করেছে, কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে এবং বাস্তবে কতটা কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসমক্ষে আনার দাবিও উঠছে জোরালোভাবে। বরাকবাসীর স্পষ্ট বক্তব্য, উন্নয়নের নামে আর প্রহসন নয়। জনগণের টাকায় নির্মিত জাতীয় সড়ক যদি মানুষের জীবনকেই দুর্বিষহ করে তোলে, তাহলে তার দায় এড়াতে পারে না কোনো সংস্থা বা প্রশাসন।

উপত্যকার সচেতন নাগরিকদের একাংশের অভিযোগ, বহিঃরাজ্যের কিছু নির্মাণ সংস্থা বরাকে শুধুমাত্র ব্যবসার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। কাজের মান, সরকারি গাইডলাইন কিংবা জনস্বার্থ সবকিছুকেই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছে দায়সারা নির্মাণ। ফলে কয়েক মাস তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে রাস্তা নির্মাণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পিচ উঠে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে গর্ত, ধসে পড়ছে রাস্তার অংশ।

বিশেষ করে এমকেসি, জান্ডু কনস্ট্রাকশন, জে ইনফ্রা, ভারতীয় কোম্পানি, এ কে বিল্ডার, কে এম আর সহ একাধিক নির্মাণ সংস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, এই সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করতে হবে এবং প্রমাণ মিললে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে। কারণ, জনগণের করের টাকায় তৈরি রাস্তার এই অবস্থা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিটুমিনাস কংক্রিট (BC) ঢালাই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিটুমিনাস কংক্রিট বসানোর সময় নির্ধারিত তাপমাত্রা প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় থাকলেই রাস্তার সঙ্গে উপকরণের সঠিক বন্ধন তৈরি হয় এবং নির্মাণের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, অন্য জেলা থেকে মিক্সিং প্ল্যান্টে প্রস্তুত করা সামগ্রী ট্রাকে করে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আনার ফলে সেই তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রায় ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি নেমে আসে বলে দাবি তাদের। এর ফলে রাস্তার উপর বিটুমিনাস কংক্রিট সঠিকভাবে বসতে পারে না এবং উপকরণের সঙ্গে রাস্তার প্রয়োজনীয় সংযোগও তৈরি হয় না। ফলস্বরূপ, নির্মাণের অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই রাস্তার বিভিন্ন অংশে ফাটল, খোয়া উঠে যাওয়া ও ভেঙে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এবং নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।

এখানেই শেষ নয়। উপত্যকার মানুষ আরও অভিযোগ তুলেছেন, মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেও অবাধে বিটুমিনাস কংক্রিট ঢালাই করা হয়েছে। অথচ প্রকৌশল নিয়ম অনুযায়ী বৃষ্টির মধ্যে বিটুমিনাস কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ ভেজা অবস্থায় বিটুমিনাস স্তর কখনোই স্থায়ী হয় না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, বৃষ্টির মধ্যেই রাতারাতি কাজ সেরে চলে যাচ্ছে ঠিকাদারি সংস্থাগুলি। আর তার ফল ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বদরপুর জাতীয় সড়কের একাধিক অংশ এখন দুর্নীতির জীবন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, কোথাও কোথাও রাস্তা নির্মাণের একদিনের মধ্যেই পিচ উঠে গিয়েছে, বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ভারী বৃষ্টির পরে সেই রাস্তা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে যাতায়াত করছেন হাজার হাজার মানুষ। অথচ অভিযোগ জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছাড়াও এন এইচ আই ডি সি এল-এর গাইডলাইন নিয়েও উঠেছে বড় প্রশ্ন।

নিয়ম অনুযায়ী রাস্তা নির্মাণে প্রথমে DBM (Dense Bituminous Macadam) ডেন্স বিটুমিনাস ম্যাকাডাম প্রায় ৬০ মিমি এবং তার উপর বিটুমিনাস কংক্রিট  প্রায় ৫০ মিমি স্তর দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই মানদণ্ড আদৌ মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অনেকের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় পুরুত্ব না রেখেই তড়িঘড়ি কাজ শেষ করা হচ্ছে। ফলে রাস্তার আয়ু ভয়াবহ ভাবে কমে যাচ্ছে।

সচেতন মহলের প্রশ্ন, যদি সমস্ত কাজ নিয়ম মেনেই হয়ে থাকে, তাহলে নতুন রাস্তা এত দ্রুত ভাঙছে কেন? কেন বারবার একই রাস্তা মেরামতের নামে নতুন করে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ আসছে? তাহলে কি জনগণের টাকায় চলছে “কমিশন রাজ”? উপত্যকার বহু প্রবীণ নাগরিকের বক্তব্য, আগে কম প্রযুক্তি থাকলেও রাস্তা বছরের পর বছর টিকে থাকত। আর এখন আধুনিক প্রযুক্তি, বিশাল বাজেট ও বড় বড় সংস্থা থাকা সত্ত্বেও কয়েক মাসের মধ্যেই রাস্তার বেহাল দশা!

এর পেছনে শুধুই কি অব্যবস্থা, নাকি রয়েছে গভীর দুর্নীতির যোগসাজশ, সেই প্রশ্ন এখন জনমনে। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, নির্মাণকাজ চলাকালীন কোনো স্বচ্ছতা নেই। কোথাও প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য টাঙানো নেই, কোথাও মান নির্ধারণকারী আধিকারিকদের উপস্থিতি চোখে পড়ে না। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুললেই ঠিকাদার সংস্থার লোকজন দুর্ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

বরাক উপত্যকায় জাতীয় সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের নামে আদৌ কি উন্নয়ন হচ্ছে, নাকি চলছে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি এবং জনগণের টাকার অপচয়? বর্তমানে এই প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি গুঞ্জন চলছে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জাতীয় সড়কের করুণ অবস্থা দেখে ক্ষোভে ফুঁসছে বরাকবাসী। উন্নয়নের বড় বড় প্রতিশ্রুতির আড়ালে বাস্তবে উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর চিত্র ভাঙাচোরা রাস্তা, নিম্নমানের নির্মাণ কাজ এবং চরম জনদুর্ভোগ।

অভিযোগ উঠেছে, জাতীয় সড়ক পরিকাঠামো উন্নয়ন নিগম এন এইচ আই ডি সি এল-এর অধীনে কাজ করা বহিঃরাজ্যের একাধিক নির্মাণ সংস্থা দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে নিম্নমানের কাজ করছে। কোথাও নির্মাণ শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই রাস্তার পিচ উঠে যাচ্ছে, কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়ে প্রতিদিন দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই বহু অংশ জলমগ্ন হয়ে পড়ছে, ফলে যান চলাচল কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ মানুষ, রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্স, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, ব্যবসায়ী এবং নিত্যযাত্রীরা। দীর্ঘ যানজট, ধুলাবালি, কাদাজল এবং ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তার কারণে প্রতিদিন নাজেহাল হতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। বর্ষা এলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে সঠিক মান বজায় রাখা হচ্ছে না।

নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, অপরিকল্পিত কাজ এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবের কারণেই অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তার এই বেহাল দশা তৈরি হয়েছে। অথচ কাগজে-কলমে কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের হিসাব দেখানো হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে, জনগণের করের টাকা আসলে কোথায় যাচ্ছে? সচেতন মহলের দাবি, শুধুমাত্র দায়সারা সংস্কার নয়, বরং গোটা নির্মাণ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কোন সংস্থা কত টাকার কাজ পেয়েছে, কী মানের কাজ করেছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কোথায় গাফিলতি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে আনার দাবিও উঠছে জোরালোভাবে।

বরাকবাসীর বক্তব্য স্পষ্ট, উন্নয়নের নামে এমন প্রহসন আর মেনে নিতে রাজি নয় উপত্যকার মানুষ। জনগণের টাকায় নির্মিত জাতীয় সড়ক যদি মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তার দায় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং নির্মাণ সংস্থাগুলিকেই নিতে হবে। এখন দেখার, এই ক্ষোভ ও অভিযোগের পর প্রশাসন আদৌ কোনও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে কি না, নাকি সবকিছু আগের মতোই ধামাচাপা পড়ে যায়।

Related Posts

মাদকমুক্ত বরাকের স্বপ্ন কি অধরাই থেকে যাবে? শিলচরে প্রকাশ্যে মাদকসেবনের অভিযোগে চাঞ্চল্য, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ

ফাটক বাজার, সদর থানা পর্যন্ত ছড়ানো নেশার রমরমা, পুলিশি অভিযানের পরও থামছে না প্রবণতা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১০ জুনঃ বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার সদর শহর শিলচরে মাদকসেবনের অভিযোগ সংবলিত…

লক্ষীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের জয়পুর–হরিনগর সড়কের বেহাল দশায় ক্ষুব্ধ জনতা, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় প্রশ্নের মুখে উন্নয়নের দাবি

বর্ষায় জলমগ্ন আর গ্রীষ্মে ধুলোর ঝড়, বছরের পর বছর সংস্কারহীন সড়কে চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১০ জুনঃ আধুনিক উন্নয়নের ঢক্কানিনাদ আর কাগুজে অগ্রগতির হিসাবের মাঝেই বাস্তবের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *