বর্ষায় জলমগ্ন আর গ্রীষ্মে ধুলোর ঝড়, বছরের পর বছর সংস্কারহীন সড়কে চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১০ জুনঃ আধুনিক উন্নয়নের ঢক্কানিনাদ আর কাগুজে অগ্রগতির হিসাবের মাঝেই বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে এক নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে লক্ষীপুরের জয়পুর–হরিনগর সংযোগকারী সড়কে। প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের একাংশ আজ কার্যত চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কোথাও গভীর গর্ত, কোথাও আবার কাদা-পানির স্থায়ী জলাশয় দূর থেকে দেখলে বোঝাই দায়, এটি সড়ক নাকি কোনো পরিত্যক্ত পুকুর।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এই সড়কের বেহাল দশা চললেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ও স্থায়ী সংস্কারের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। সাময়িকভাবে কোথাও কোথাও জোড়াতালি দিয়ে গর্ত ভরাট করা হলেও তা কয়েক দিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। ফলে ভোগান্তি যেন এখন এই এলাকার মানুষের নিত্যদিনের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এলাকাবাসীর বর্ণনা অনুযায়ী, সড়কটির বর্তমান অবস্থা যেন দুর্ভোগের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। শুকনো মৌসুমে এই রাস্তা ধুলোয় ঢেকে একপ্রকার ধুলোঝড়ের রূপ নেয়। সামান্য যানবাহন চলাচল করলেই চারপাশে ঘন ধুলোর মেঘ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে পথচারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ধুলাবালির কারণে শ্বাসকষ্ট, চোখের জ্বালা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যারও সম্মুখীন হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
রাস্তার বিভিন্ন অংশে জমে যায় হাঁটুসমান জল ও কাদা, সৃষ্টি হয় অসংখ্য গর্ত এবং বিপজ্জনক ফাঁদের। ফলে প্রতিদিনের যাতায়াত হয়ে ওঠে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্বিষহ। স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রী, কর্মজীবী মানুষ, রোগী বহনকারী যানবাহন সকলকেই চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। ক্ষোভ প্রকাশ করে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, বর্ষার সময় মনে হয় যেন নদী পার হচ্ছি, আর গরমের সময় মনে হয় মরুভূমির মধ্যে চলাফেরা করছি। এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা মানেই প্রতিদিন নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা।
স্থানীয়দের মতে, বছরের পর বছর ধরে সড়কের এমন বেহাল অবস্থা চললেও স্থায়ী সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে সড়কটির সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগের আশঙ্কা রয়েছে।
এই বেহাল সড়কের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। খানাখন্দে ভরা পথে মোটরসাইকেল, অটো ও ছোট গাড়ি প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বহু যানবাহন অকালেই বিকল হয়ে পড়ছে, ফলে বাড়ছে আর্থিক ক্ষতির বোঝা। একাধিক চালকের দাবি, গাড়ি মেরামতের খরচ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলতে হয়, কিন্তু বিকল্প রাস্তা না থাকায় বাধ্য হয়েই এই পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এই সড়কের দুরবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে স্কুল–কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ওপর। বর্ষার সময় জল-কাদা পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় অভিভাবকরাও সন্তানদের পাঠাতে ভয় পান। এক অভিভাবকের অভিযোগ, ছোট বাচ্চারা কাদায় পড়ে যায়, বই-খাতা নষ্ট হয়ে যায়। পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু কেউ দেখার নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুবার প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে লিখিত ও মৌখিকভাবে সড়ক সংস্কারের দাবি জানানো হলেও কার্যত কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। শুধু সাময়িক মেরামতের নামে কিছু অংশে কাজ হলেও, সবচেয়ে বেহাল প্রায় তিন কিলোমিটার অংশকে কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, যখন উন্নয়নের নানা প্রকল্পের প্রচার সর্বত্র শোনা যায়, তখন এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের এমন দুরবস্থা কেন বছরের পর বছর ধরে অমীমাংসিত রয়ে যাচ্ছে?
স্থানীয়দের ক্ষোভ এখন প্রশাসনের উদাসীনতার দিকেই ঘুরে গেছে। তাঁদের অভিযোগ, উন্নয়নের বড় বড় প্রতিশ্রুতির আড়ালে গ্রামীণ এলাকার মৌলিক অবকাঠামোর এই করুণ দশা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত। একজন প্রবীণ বাসিন্দার আক্ষেপ, যদি এটাকে উন্নয়ন বলা হয়, তাহলে আমাদের এই যন্ত্রণা কী? আমরা কি এই ব্যবস্থার বাইরে পড়ে আছি?
এলাকাবাসীরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে তাঁরা বৃহত্তর গণআন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন। তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সড়কটির বেহাল অবস্থার কথা প্রশাসনের নজরে আনা হলেও স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষ ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে।
স্থানীয়দের দাবি, কেবলমাত্র সাময়িক মেরামত বা গর্ত ভরাট করে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয়, বরং আধুনিক মানদণ্ড অনুযায়ী টেকসই ও মানসম্পন্ন সড়ক নির্মাণ করতে হবে। কারণ এই রাস্তা শুধু কয়েকটি গ্রামের যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সব মিলিয়ে, জয়পুর–হরিনগর সড়কের প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ বেহাল অংশটি আজ শুধুমাত্র একটি ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগপথের নাম নয়, এটি প্রশাসনিক উদাসীনতা ও দীর্ঘদিনের অবহেলার এক জ্বলন্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
প্রতিদিন ধুলো, কাদা, গর্ত এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে এলাকাবাসীর কণ্ঠে এখন একটাই প্রশ্ন বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, কতদিন আর এই দুর্ভোগ সহ্য করতে হবে? কবে মিলবে এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তি? এবং কবে বাস্তবে রূপ পাবে একটি নিরাপদ, টেকসই ও জনবান্ধব সড়কের বহুদিনের দাবি?





