রামকৃষ্ণনগরের গামারিয়ায় প্রেমঘটিত বিরোধের জেরে গৃহবধূ খুন, লামডিং থেকে আটক অভিযুক্ত

ঘটনাটি সামনে আসতেই পুরো এলাকা কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা সম্পর্ক, সামাজিক চাপ এবং পারিবারিক বিচ্ছেদের এক করুণ পরিণতি। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনবিল গামারিয়া গ্রামের বাসিন্দা রোসনা বেগমের স্বামী মতিউর রহমান দীর্ঘদিন ধরে কর্মসূত্রে বেঙ্গালুরুতে অবস্থান করছিলেন। সেই সময়েই আলগাপুর মোহনপুর পার্ট–১ এলাকার বাসিন্দা এবাদ উদ্দিন লস্করের সঙ্গে রোসনা বেগমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ ওঠে।

প্রায় এক মাস আগে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে যখন স্বামীর বাড়িতে দুজনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা। এরপর তাদের আটক করে কালীবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে জানা যায়। এই ঘটনার পর থেকেই শুরু হয় সামাজিক অস্থিরতা ও পারিবারিক বিচ্ছেদ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, রোসনা বেগমকে স্বামী আর গ্রহণ করেননি বলে দাবি পরিবারের। তিন সন্তানকে নিয়ে তিনি বাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরিবারের অভিযোগ, বাবার বাড়িতেও শান্তিতে ছিলেন না রোসনা বেগম।

ঘটনার দিন সকাল থেকেই অভিযুক্ত এবাদ উদ্দিন লস্কর তাকে ফোন করে একসঙ্গে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। রোসনা বেগম এতে রাজি না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, পরে অভিযুক্ত ব্যক্তি গামারিয়ার বাড়ির সামনে এসে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এরপর রোসনা বেগম বাড়ি থেকে বের হলে তাকে জোরপূর্বক টেনে নিয়ে গিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, রোসনা বেগমের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে অভিযুক্ত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

গুরুতর জখম অবস্থায় স্থানীয়রা দ্রুত রোসনা বেগমকে উদ্ধার করে প্রথমে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে তাকে শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও শেষ রক্ষা হয়নি, চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গামারিয়া গ্রামে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া এবং একইসঙ্গে ক্ষোভে ফেটে পড়ে স্থানীয় জনতা।

ঘটনার পর রামকৃষ্ণনগর থানায় পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত শুরু করে পুলিশ। প্রযুক্তিগত নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পলাতক অভিযুক্ত এবাদ উদ্দিন লস্করকে লামডিং রেলস্টেশন এলাকা থেকে আটক করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তবে কীভাবে তিনি এলাকা ছেড়ে পালালেন, এবং এই ঘটনার পেছনে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই ঘটনাকে ঘিরে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও উত্তেজনার পরিবেশ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন—একটি সম্পর্কগত বিরোধ কীভাবে এতটা ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে রূপ নিল? আবার অনেকেই সামাজিক চাপ, গুজব ও পারিবারিক বিচ্ছেদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করছেন। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংঘাত নয়, বরং সামাজিক মানসিকতা, সহনশীলতার অভাব এবং দ্রুত ভেঙে পড়া পারিবারিক কাঠামোর এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

পুলিশ জানিয়েছে, পুরো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চলছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ, পূর্ব পরিকল্পনা ছিল কি না, এবং অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন। এই নির্মম ঘটনার পর গামারিয়ার আকাশে এখন শুধুই শোক আর প্রশ্ন, ভালোবাসার নামে কি তবে আবারও রক্ত ঝরল?

Related Posts

কালাইন কো-অপারেটিভে প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা (পিএমজিকেএওয়াই) চাল পরিবহণে কোটি টাকার ঘাপলা!

বিল হচ্ছে রামনগরের নামে, চাল আসছে বদরপুর এফসিআই থেকে! গাড়িপ্রতি ২,৩০০ টাকার ভুয়া বিল বানিয়ে পকেটস্থ! বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ অক্টোবরঃ সরকারি সমবায় ব্যবস্থায় কি শেষপর্যন্ত দুর্নীতির ঘুণ ধরেছে? কালাইন…

মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কাছাড়ের লক্ষ্মীপুরের বুকে দিব্যি চলছে অবৈধ লটারির রমরমা জুয়ার আসর

আদালতের নিষেধাজ্ঞা শিকেয় তুলে রমরমা! লক্ষ্মীপুরে লটারির নামে কোটি টাকা হাতিয়ে চম্পট প্রতারক চক্র বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক 28 অক্টোবরঃ মহামান্য আদালত এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্পষ্ট ফরমান রাজ্যে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *