তিন মাসেই ধসে পড়ল নতুন রাস্তা, মরণফাঁদে পরিণত লক্ষীরবন্দের গঙ্গাপার ধুমকর সড়ক, নিম্নমানের কাজ ও পূর্ত বিভাগের গাফিলতিতে মৃত্যুফাঁদে পরিণত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এটি কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়, বরং পরিকল্পনার অভাব, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং পূর্ত বিভাগের চরম উদাসীনতার জ্বলন্ত উদাহরণ। স্থানীয়দের দাবি, রাস্তার একেবারে পাশ দিয়েই বয়ে গেছে লক্ষ্মীনগর খাল। দীর্ঘদিন ধরে খালটির গভীরতা বেড়ে যাওয়া, পাড় ভাঙন এবং সঠিকভাবে সংস্কার না হওয়ার কারণে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে রাস্তার নীচের মাটি। বর্ষার জলচাপ ও মাটির ক্ষয়ের ফলে রাস্তার ভিত ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে। অথচ এই মূল সমস্যার সমাধান না করেই শুধুমাত্র উপরের অংশে ব্লক বসিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। ফলে কয়েক মাস না যেতেই রাস্তার প্রকৃত চেহারা সামনে চলে এসেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, এই রাস্তা শুধুমাত্র একটি গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা নয়, বরং বহু গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, রোগী নিয়ে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্স, ব্যবসায়িক যানবাহনসহ শতাধিক ছোট-বড় গাড়ি চলাচল করে। বর্তমানে রাস্তার মাঝখানে বড়সড় ধস নামায় যেকোনও মুহূর্তে ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

এলাকাবাসীর ক্ষোভ, সরকারি অর্থ ব্যয় করে রাস্তা নির্মাণের নামে শুধুমাত্র চোখে ধুলো দেওয়ার কাজ করা হচ্ছে। মানুষের করের টাকায় তৈরি হওয়া রাস্তা যদি তিন মাসও টিকতে না পারে, তাহলে নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। স্থানীয়দের একাংশ সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, কাজের গুণগত মান রক্ষার কোনও তদারকি ছিল না। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার অভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, এর আগেও একই জায়গায় একাধিকবার ধস নেমেছিল। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে বারবার শুধুমাত্র অস্থায়ী মেরামতির কাজ চালিয়ে গিয়েছে পূর্ত বিভাগ। ফলে সমস্যার মূলে হাত না দিয়ে উপরিভাগে প্রলেপ লাগানোর সংস্কৃতি এখন এলাকাবাসীর কাছে একপ্রকার ‘সরকারি রুটিনে’ পরিণত হয়েছে। মানুষের প্রশ্ন, যখন জানা ছিল খালের ক্ষয়ই মূল কারণ, তখন কেন খালের পাড় সংরক্ষণ, মাটি বাঁধাই কিংবা শক্তিশালী রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হল না?

স্থানীয় সচেতন মহলের বক্তব্য, কোনও সড়ক নির্মাণের আগে মাটি পরীক্ষা, জলপ্রবাহের গতিপথ বিশ্লেষণ এবং ভূগর্ভস্থ স্থিতিশীলতা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানে সেই সমস্ত প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দিক সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে বলেই অভিযোগ। শুধুমাত্র দ্রুত কাজ শেষ দেখিয়ে ফাইল বন্ধ করার প্রবণতাই আজ সাধারণ মানুষের জীবনে বিপদ ডেকে আনছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন পূর্ত বিভাগের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। প্রশ্ন উঠছে, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত সামগ্রীর মান কি আদৌ পরীক্ষা করা হয়েছিল? কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে কোনও প্রযুক্তিগত পরিদর্শন হয়েছিল কি? নাকি ঠিকাদারি প্রথা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার চাপে সবকিছুই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকেছে? এলাকাবাসীর দাবি, আর কোনও সাময়িক মেরামতি নয়, এই রাস্তার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।

খালের বৈজ্ঞানিক সংস্কার, পাড় সংরক্ষণ, শক্তিশালী ভিত্তি নির্মাণ এবং উচ্চমানসম্পন্ন সামগ্রী ব্যবহার করেই নতুন করে রাস্তা নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি গোটা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়িত্বে গাফিলতি থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও উঠেছে। এখন বড় প্রশ্ন একটাই, প্রশাসন কি সত্যিই মানুষের দুর্ভোগ বুঝে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে হাঁটবে, নাকি কয়েক বস্তা বালি, কিছু ব্লক আর সাময়িক মেরামতির মধ্যেই আবারও চাপা পড়বে লক্ষীরবন্দের মানুষের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা? সময়ই দেবে সেই উত্তর।

Related Posts

মাদকমুক্ত বরাকের স্বপ্ন কি অধরাই থেকে যাবে? শিলচরে প্রকাশ্যে মাদকসেবনের অভিযোগে চাঞ্চল্য, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ

ফাটক বাজার, সদর থানা পর্যন্ত ছড়ানো নেশার রমরমা, পুলিশি অভিযানের পরও থামছে না প্রবণতা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১০ জুনঃ বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার সদর শহর শিলচরে মাদকসেবনের অভিযোগ সংবলিত…

লক্ষীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের জয়পুর–হরিনগর সড়কের বেহাল দশায় ক্ষুব্ধ জনতা, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় প্রশ্নের মুখে উন্নয়নের দাবি

বর্ষায় জলমগ্ন আর গ্রীষ্মে ধুলোর ঝড়, বছরের পর বছর সংস্কারহীন সড়কে চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১০ জুনঃ আধুনিক উন্নয়নের ঢক্কানিনাদ আর কাগুজে অগ্রগতির হিসাবের মাঝেই বাস্তবের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *