স্কুল থেকে ফেরার পথে নাবালিকাকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ, চিৎকারে ছুটে এসে অভিযুক্তকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন স্থানীয়রা
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ মেঃ শ্রীভূমি জেলার রামকৃষ্ণনগর থানার অন্তর্গত শনবিল ভৈরবনগর এলাকায় এক নবম শ্রেণির স্কুলছাত্রীকে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় গোটা এলাকাজুড়ে আতঙ্ক, ক্ষোভ এবং উদ্বেগের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে জনমনে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বাসিন্দা সুমন মণ্ডল। পিতার নাম মান্নান মণ্ডল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফেরিওয়ালার কাজের সূত্রে বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করতেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ, স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে এক নবম শ্রেণির নাবালিকা ছাত্রীকে লক্ষ্য করে অভিযুক্ত আচমকা তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রথমে ঘটনাটি বুঝে উঠতে না পারলেও ওই ছাত্রীর চিৎকারে আশপাশের মানুষ সতর্ক হয়ে ওঠেন। মুহূর্তের মধ্যেই এলাকার বহু মানুষ ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। অভিযোগ, পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে ধরে ফেলেন। পরে উত্তেজিত জনতা তাকে রামকৃষ্ণনগর পুলিশের হাতে তুলে দেন।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ভৈরবনগর ও সংলগ্ন এলাকায় তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বহু অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্কুলে পড়তে যাওয়া মেয়েরাও যদি আজ নিরাপদ না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপত্তা পাবে? অনেকের অভিযোগ, এলাকায় বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত থাকলেও তাঁদের পরিচয় যাচাই বা নজরদারির ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত দুর্বল।
স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, ফেরিওয়ালা, ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী কিংবা অস্থায়ী শ্রমিকদের পরিচয় যাচাইয়ের কোনও সুসংহত ব্যবস্থা নেই। ফলে কে কোথা থেকে এসে কোন এলাকায় ঘোরাফেরা করছে, তার কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রশাসনের কাছে থাকে না। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেই পুরনো প্রশ্নই ফের সামনে চলে এসেছে। এলাকার অভিভাবকদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরেই স্কুলপড়ুয়া ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল।
স্কুল ছুটির সময় বিভিন্ন অপরিচিত ব্যক্তিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেলেও সেভাবে নজরদারি বাড়ানো হয়নি। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, গ্রামীণ এলাকায় পুলিশি টহল কার্যত নামমাত্র। ফলে অসামাজিক কার্যকলাপের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। ঘটনার পর অভিযুক্তকে আটক করে রামকৃষ্ণনগর থানার পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে। পরে তার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয় এবং তাকে করিমগঞ্জ আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং নাবালিকার পরিবারের বক্তব্যও গুরুত্ব সহকারে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
তবে এই ঘটনায় শুধু একজন অভিযুক্তের গ্রেফতারেই দায় শেষ হয়ে যায় না বলেই মনে করছেন সচেতন মহল। তাঁদের মতে, প্রশ্ন উঠছে গোটা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঘিরে। স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? স্কুলের আশপাশে নিয়মিত নজরদারি কেন নেই? বহিরাগতদের তথ্য সংরক্ষণ বা যাচাইয়ের কোনও কার্যকর ব্যবস্থা কেন গড়ে ওঠেনি? অনেকের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ বৃদ্ধির ঘটনাগুলি প্রশাসনের জন্য বড় সতর্কবার্তা হওয়া উচিত ছিল।
অথচ বাস্তবে বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ঘটনা ঘটার পর প্রশাসন সক্রিয় হলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়ছে। তবে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও ধরনের গুজব বা উসকানিমূলক মন্তব্য না করার আবেদন জানানো হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে এমন পোস্ট থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।
এদিকে ঘটনার পর থেকেই এলাকায় আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে। অনেক অভিভাবক এখন সন্তানদের একা স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে স্কুল এলাকায় পুলিশি টহল বাড়ানো, সিসিটিভি বসানো এবং সন্দেহভাজন বহিরাগতদের উপর নজরদারি জোরদার করতে হবে। ভৈরবনগরের এই ঘটনা আবারও স্পষ্ট করে দিল, নারী ও শিশু নিরাপত্তার প্রশ্নে সামান্য গাফিলতিও কত বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। সময় থাকতে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।






