বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ২৭ মার্চঃ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যখন ঘরে ঘরে রান্নার গ্যাসের তীব্র সঙ্কট সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে, ঠিক সেই সময়েই এক বিপরীত চিত্র জনসমক্ষে উঠে আসছে। বাজারের হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ফাস্টফুড দোকানগুলিতে ডমেস্টিক গ্যাস সিলিন্ডারের অবাধ ব্যবহার মানুষের মনে তৈরি করছে ক্ষোভ, বিস্ময় এবং একাধিক প্রশ্ন।
সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, গ্যাস বুকিং করার পর সপ্তাহের পর সপ্তাহ কোথাও বা মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও তারা সিলিন্ডার হাতে পাচ্ছেন না। রান্নার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার বিকল্প ও ব্যয়বহুল পথ বেছে নিতে হচ্ছে। অথচ একই সময়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে কীভাবে সহজেই ডমেস্টিক গ্যাস সিলিন্ডার পৌঁছে যাচ্ছে, তা নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বাণিজ্যিক কাজে ডমেস্টিক গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে কমার্শিয়াল সিলিন্ডার ব্যবহারের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা, শহর থেকে গ্রাম, প্রায় সর্বত্রই হোটেল ও খাবারের দোকানগুলিতে প্রকাশ্যেই ব্যবহার করা হচ্ছে ডমেস্টিক সিলিন্ডার।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বাণিজ্যে ডমেস্টিক সিলিন্ডার, বেআইনি ব্যবহারে নীরব প্রশাসন
যেন আইন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবায়নের কোনও দৃঢ়তা নেই। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এই বেআইনি ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কার্যত কোনও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। নেই নজরদারি, নেই কঠোর অভিযান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে, এই নীরবতার আড়ালে কি কোনও প্রভাবশালী চক্র কাজ করছে?

এই পরিস্থিতি শুধু আইনভঙ্গের ইঙ্গিতই দেয় না, বরং সাধারণ মানুষের প্রতি এক ধরনের অবিচারের ছবিও তুলে ধরে। যেখানে একদিকে সাধারণ মানুষ তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত, অন্যদিকে কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভেঙে নির্বিঘ্নে সুবিধা ভোগ করছে। অভিযোগ আরও গুরুতর।
সাধারণ মানুষ যেখানে একটি সিলিন্ডারের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন, সেখানে একাংশ ব্যবসায়ীর কাছে একাধিক ডমেস্টিক সিলিন্ডার মজুত থাকার ঘটনাও সামনে আসছে। এতে স্পষ্টতই কালোবাজারির ইঙ্গিত পাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। অনেকেই অভিযোগ করছেন, গ্যাস এজেন্সি ও ডেলিভারি ব্যবস্থার মধ্যেই গড়ে উঠেছে এক অস্বচ্ছ চক্র, যারা গোপনে ডমেস্টিক সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করছে, আর সাধারণ গ্রাহকদের ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।
এদিকে, বাজারে রান্না করা খাবারের দামও হু হু করে বেড়ে গেছে। দোকানদারদের কাছে কারণ জানতে চাইলে একটাই উত্তর, গ্যাসের আকাল। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যদি সত্যিই গ্যাসের এত সঙ্কট হয়, তবে দোকানগুলোতে অবিরাম রান্না চলছে কীভাবে? এই দ্বিচারিতা নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই বহু মানুষ নিজেদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেছেন।
গ্যাস সঙ্কটে জনজীবন বিপর্যস্ত, সরবরাহ ব্যবস্থায় বড়সড় অনিয়মের ইঙ্গিত
কেউ বলছেন, বুকিং করার পর ডেলিভারির কোনও খবর নেই, কেউ আবার অভিযোগ করছেন, এজেন্সিতে ফোন করলেও কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে পুরনো কেরোসিন স্টোভ বা কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করছেন, যা শুধু কষ্টসাধ্যই নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সাধারণ মানুষ এখন সরাসরি কালোবাজারি ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলতে শুরু করেছেন। তাঁদের মতে, একটি শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী চক্র প্রশাসনের চোখের সামনে থেকেই এই বেআইনি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আর প্রশাসনের নীরবতা এই চক্রকে আরও উৎসাহিত করছে।
সরকারের তরফে বারবার দাবি করা হচ্ছে, রাজ্যে গ্যাসের কোনও ঘাটতি নেই, পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশ্ন উঠছে, যদি মজুত যথেষ্ট থাকে, তবে কেন সাধারণ মানুষ গ্যাস পাচ্ছেন না? আর যদি সত্যিই সঙ্কট থাকে, তবে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এত অবাধ ব্যবহার কীভাবে সম্ভব? এই দ্বৈত বাস্তবতার জবাব এখনই চায় সাধারণ মানুষ। তাদের দাবি, অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং বেআইনি মজুত ও কালোবাজারি বন্ধে কড়া নজরদারি চালু করা জরুরি।
নচেৎ, এই সঙ্কট শুধু রান্নাঘরের সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি ধীরে ধীরে জনঅসন্তোষের বৃহত্তর আগুনে পরিণত হতে পারে। আর সেই আগুনের দায়ভার এড়ানো কঠিন হবে প্রশাসনের পক্ষে। এখন সময় এসেছে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার। প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, নিয়মভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা এবং গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কারণ রান্নার গ্যাস কোনও বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অংশ। সেই প্রয়োজন পূরণে বৈষম্য ও অনিয়ম কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।


