বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ২৭ মার্চঃ শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বরাক উপত্যকার অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্যকেন্দ্র আজ এক গভীর সংকটের মুখে। গত প্রায় কুড়ি দিন ধরে এখানে সিটি স্ক্যান পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন শতাধিক রোগী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। চিকিৎসার জন্য এই সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে পরিস্থিতি এখন কার্যত অসহায়তার প্রতিচ্ছবি।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাঁদের পরিজনদের অভিযোগ, সিটি স্ক্যান পরিষেবা বন্ধ থাকায় চিকিৎসা প্রক্রিয়াই থমকে যাচ্ছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনা, স্ট্রোক বা অন্যান্য জটিল অসুস্থতার ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যান একটি অত্যাবশ্যকীয় পরীক্ষা যার ওপর নির্ভর করে দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা। কিন্তু সেই জরুরি পরিষেবা না থাকায় রোগীদের জীবনই পড়ছে চরম ঝুঁকির মুখে।

অকেজো মেশিনে বছরের পর বছর চিকিৎসা! প্রাইভেট নার্সিংহোমে ছুটছেন রোগীরা, গাফিলতি না কি পরিকল্পিত বিলম্ব?
এই অবস্থায় বাধ্য হয়ে বহু রোগীকে অতিরিক্ত খরচ বহন করে প্রাইভেট নার্সিংহোমের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। যেখানে একদিকে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে চিকিৎসার আশায় মানুষ আসেন, সেখানে হঠাৎ এই অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তাঁদের জন্য এক বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এতদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা বন্ধ থাকলেও কেন তার দ্রুত সমাধান হচ্ছে না? প্রশাসনের তরফে কেন নেই দৃশ্যমান কোনও জরুরি উদ্যোগ?
জরুরি ক্ষেত্রে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি, প্রাইভেট সেন্টারে বাড়তি খরচে নাজেহাল সাধারণ মানুষ
স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এই পরিস্থিতি কেবল একটি পরিষেবা বন্ধ থাকার ঘটনা নয়, বরং গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনে দেয়। এখন সময় এসেছে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার যাতে সিটি স্ক্যান পরিষেবা অবিলম্বে চালু হয় এবং রোগীদের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মেলে। কারণ চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান, আর সেই মূল্যবান সময় হারানো মানেই কখনও কখনও একটি জীবনের ঝুঁকি।

জরুরি ক্ষেত্রে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি, প্রাইভেট সেন্টারে বাড়তি খরচে নাজেহাল সাধারণ মানুষ
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সিটি স্ক্যান মেশিনটি প্রায় কুড়ি দিন ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এ বিষয়ে হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. ভাস্কর গুপ্তর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ছুটিতে রয়েছেন বলে জানানো হয়। পরে সুপার ডা. বিকাশ শান্ডিল জানান, মেশিন খারাপ হওয়ায় অসুবিধা হচ্ছে ঠিকই, তবে আপাতত রোগীদের শিলচর ক্যান্সার হাসপাতাল পাঠানো হচ্ছে, যেখানে উন্নত সিটি স্ক্যান সুবিধা রয়েছে।
শিগগিরই নতুন মেশিন আনা হবে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। সুপারের আরও একটি স্বীকারোক্তি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। তাঁর কথায়, মেডিকেলের সিটি স্ক্যান মেশিনটি নাকি গত দেড় থেকে দু’বছর ধরেই কার্যত অকেজো ছিল, এবং নির্ভরযোগ্য রিপোর্ট পাওয়া যেত না। তবুও সেই মেশিন দিয়েই এতদিন চিকিৎসা চলেছে। এই তথ্য সামনে আসতেই উঠছে গুরুতর প্রশ্ন, অবিশ্বস্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে এতদিন কীভাবে রোগীদের চিকিৎসা করা হয়েছে? এতে কি ভুল চিকিৎসার সম্ভাবনা তৈরি হয়নি?
অচল মেশিনে চিকিৎসা! শিলচর মেডিকেলে চাঞ্চল্যকর তথ্য
এদিকে, জরুরি বিভাগের রোগীদের অবস্থা আরও শোচনীয়। দুর্ঘটনা বা গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে দ্রুত সিটি স্ক্যান না হলে চিকিৎসায় বিলম্ব ঘটে, যা সরাসরি মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অন্য হাসপাতালে রোগী স্থানান্তর করতে সময় লাগে, অ্যাম্বুল্যান্সের অভাব বা আর্থিক সমস্যার কারণে অনেক পরিবারই বিপাকে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কেন এতদিন ধরে নতুন মেশিন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি?
সিটি স্ক্যান না থাকায় বিপাকে রোগী, গাফিলতি না কি পরিকল্পিত বিলম্ব?
কেন একটি অকেজো মেশিন দিয়ে বছরের পর বছর চিকিৎসা চালানো হয়েছে? এর পেছনে কি শুধুই প্রশাসনিক গাফিলতি, নাকি অন্য কোনও স্বার্থ জড়িত? স্থানীয় মানুষের একাংশের অভিযোগ, এই দীর্ঘসূত্রিতা ইচ্ছাকৃতও হতে পারে। তাঁদের মতে, সরকারি হাসপাতালে সেবা বন্ধ থাকলে প্রাইভেট নার্সিংহোমগুলোর ব্যবসা বাড়ে। ফলে এই পরিস্থিতি থেকে কারা লাভবান হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
সরকারি অব্যবস্থাপনায় রোগীরা অসহায় লাভের মুখ দেখছে নার্সিংহোম
বর্তমানে শিলচরের বিভিন্ন বেসরকারি নার্সিংহোমে সিটি স্ক্যানের জন্য রোগীদের ভিড় বেড়েছে। কিন্তু সেখানে খরচ বহন করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। ফলে গরিব ও অসহায় মানুষজন কার্যত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্বাস্থ্য পরিষেবার এই বেহাল দশা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। সাধারণ মানুষের দাবি, অবিলম্বে সিটি স্ক্যান পরিষেবা পুনরায় চালু করতে হবে এবং এতদিনের গাফিলতির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নচেৎ, এই অব্যবস্থার মাশুল দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই যার মূল্য কখনও কখনও একটি জীবনের থেকেও বেশি হয়ে দাঁড়াতে পারে।


