বিপ্র নাথ বরাকবাণী ডিজিটাল ২২ মার্চঃ অসমের রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, দলবদল এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। একসময় যে দৃশ্য কেবল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দেখা যেত, আজ সেই একই চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে বিজেপির অন্দরমহলেও। ক্ষমতায় থাকার স্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে টিকিট বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ, ক্ষোভ এবং প্রকাশ্য বিদ্রোহ এসব এখন বিজেপির জন্যও অচেনা নয়।
সাম্প্রতিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর রাজ্যের একাধিক কেন্দ্রে বিজেপির টিকিট বঞ্চিত নেতাদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে ফেটে পড়েছে। দলের দীর্ঘদিনের কর্মী-নেতারা সরাসরি রাজ্য নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন, সাংবাদিক সম্মেলনে নাম ধরে ধরে সমালোচনা করছেন, যা কয়েক বছর আগেও বিজেপির সংস্কৃতিতে প্রায় অকল্পনীয় ছিল। এই পরিবর্তনই ইঙ্গিত দিচ্ছে, দলটি এখন এক ভিন্ন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
বিশেষ করে, হঠাৎ করেই কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে যোগ দিয়ে টিকিট পাওয়ার প্রবণতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে দলীয় কর্মীদের মধ্যে। যে নেতা গতকাল পর্যন্ত বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করছিলেন, আজ তিনিই গেরুয়া পতাকা হাতে তুলে নিয়ে প্রার্থী হচ্ছেন, এই দৃশ্য সাধারণ মানুষের কাছেও বিভ্রান্তিকর। আদর্শ, নীতি ও মতাদর্শের প্রশ্ন যেন এক লহমায় গৌণ হয়ে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা প্রদ্যোৎ বরদলৈ এর বিজেপিতে যোগদান এবং অল্প সময়ের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে প্রার্থী হওয়া ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই যোগদানে বিজেপির তৃণমূল স্তরের কর্মীদের মধ্যে প্রত্যাশিত উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। বরং অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। দিসপুর কেন্দ্রের প্রেক্ষাপট এই অস্থিরতার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
টিকিট বণ্টন ঘিরে ক্ষোভ, ভাঙছে শৃঙ্খলা, পুরনো কর্মীদের হতাশা, বিভ্রান্ত সাধারণ ভোটার
টিকিট না পেয়ে ক্ষুব্ধ নেতা জয়ন্তকুমার দাস যেভাবে প্রকাশ্যে দলীয় নেতৃত্বকে আক্রমণ করেছেন, তা সত্যিই নজিরবিহীন। তিনি শুধু বিদ্রোহের সুরেই কথা বলেননি, বরং সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণাও করেছেন। একসময়ের বিজেপির মুখপাত্র এবং কঠিন সময়ের কর্মী হিসেবে তার বক্তব্য দলীয় শৃঙ্খলার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, দলে একের পর এক কংগ্রেস নেতাকে এনে পুরনো ও নিষ্ঠাবান কর্মীদের কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে? তাহলে কি বিজেপিতে পুরনো কর্মীদের প্রয়োজন ফুরিয়ে আসছে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। এমনকি তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দিকেও সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, যা রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, একই কেন্দ্রের আরেক প্রবীণ নেতা অতুল বরা সিনিয়র ও প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। দলীয় সমীক্ষায় এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে টিকিট না পাওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ। এমনকি, প্রয়োজনে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের কথাও বলেছেন, যা বিজেপির অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে। এই পরিস্থিতি শুধু একটি বা দুটি কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ নয়।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে টিকিট বঞ্চিত নেতাদের বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, এমনকি দলত্যাগের ঘটনাও ক্রমশ বাড়ছে। অনেকেই একে কংগ্রেসি সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। অর্থাৎ, যেখানে প্রার্থীর গুরুত্ব দলের চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়ায়, এবং ব্যক্তিগত স্বার্থই হয়ে ওঠে মূল চালিকা শক্তি।
তবে সমস্যা শুধু বিজেপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কংগ্রেসও আজ একই ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দলীয় নেতাদের হঠাৎ দলবদল, অভ্যন্তরীণ অবিশ্বাস এবং গুপ্তচর আতঙ্ক সব মিলিয়ে কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, একজন কংগ্রেস নেতা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন, ফলে ভোটারদের মধ্যেও আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোটার সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত। তারা বুঝে উঠতে পারছেন না, কাকে বিশ্বাস করবেন? যে নেতাকে ভোট দিচ্ছেন, তিনি আদৌ নিজের দলে থাকবেন কিনা, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপরই এক ধরনের অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।
আদর্শভিত্তিক রাজনীতির পরিবর্তে যদি শুধুমাত্র ক্ষমতা ও সুযোগের রাজনীতি প্রাধান্য পায়, তাহলে দলীয় শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার ভিত্তি ভেঙে পড়বে। সব মিলিয়ে, অসমের রাজনীতি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বিজেপির অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, অন্যদিকে কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে সাধারণ ভোটার খুঁজছেন স্থিরতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। আসন্ন নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের লড়াই নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের এক বড় পরীক্ষা।


