সিভিক সেন্স’ বনাম প্রশাসনিক ব্যর্থতা, শিলচরের নাগরিকরা আর কত সইবেন? হাঁটু জল, অচল শহর, দুর্ভোগে মানুষ, তবুও দায় চাপানো হচ্ছে নাগরিকদের ওপর

বরাক উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র শিলচরের এই দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং এক নির্মম বাস্তবতা। প্রতিবারের মতো এবারও শহরবাসী জলবন্দি হওয়ার পর শুরু হয়েছে দায় এড়ানোর রাজনীতি। প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনার দায় স্বীকার না করে কিছু শাসকঘনিষ্ঠ নেতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মহল আবারও সেই পুরনো সুরে বলছেন, মানুষ প্লাস্টিক ফেলছে বলেই ড্রেন বন্ধ হচ্ছে, নাগরিকদের সিভিক সেন্স নেই, সচেতনতার অভাবেই শহরের এই দুর্দশা।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সত্যিই কি শুধু সাধারণ মানুষই দায়ী? কোটি কোটি টাকার পৌর বাজেট, আধুনিক নগরোন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক পরিকাঠামো সবকিছু থাকার পরও যদি এক পশলা বৃষ্টিতে শহর ডুবে যায়, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় কাদের কাঁধে বর্তায়? বাস্তবতা হলো, “সিভিক সেন্স”শব্দটিকে এখন অনেকেই প্রশাসনের একটি সুবিধাজনক ঢাল হিসেবে দেখছেন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যে শহরে গত ছয় বছর ধরে পুরনিগম নির্বাচনই হয়নি, সেখানে প্রশাসন কোন নৈতিকতায় নাগরিকদের ‘সিভিক সেন্স’শেখায়? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি শহরের মানুষ নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার রাখেন। কিন্তু শিলচরের মানুষ সেই অধিকার থেকেও দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত। নির্বাচিত বোর্ড না থাকায় জনগণের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ এমন কোনো জনপ্রতিনিধি কার্যত নেই। ফলে নাগরিক সমস্যাগুলোরও যেন কোনো জবাবদিহি নেই।

শুধু তাই নয়, শহরের একাধিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং নিকাশি পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নালা-নর্দমা বুজিয়ে গড়ে উঠেছে স্থাপনা। কিন্তু প্রশাসনের তরফে কার্যকর পদক্ষেপ খুব কমই দেখা যায়। ফলে বর্ষা এলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শহরের সচেতন নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি শহরের জলনিকাশি ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যাতে স্বল্প থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাতেও জল দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু শিলচরে সেই মৌলিক নগর পরিকল্পনারই যেন চরম অভাব। শহরের বহু ড্রেন বছরের পর বছর সংস্কার হয়নি। কোথাও পর্যাপ্ত ঢাল নেই, কোথাও আবার নর্দমা সরাসরি আবর্জনায় ভরে রয়েছে। ফলে বৃষ্টির জল বের হওয়ার পথই খুঁজে পায় না।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে দায়ী করার প্রবণতা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে শহরজুড়ে। নাগরিকদের একাংশ প্লাস্টিক ফেলেন,  এটা অবশ্যই ভুল এবং নিন্দনীয়। কিন্তু একটি গোটা শহরের জলনিকাশি ব্যবস্থা কি কয়েকটি প্লাস্টিক ব্যাগের কারণে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে? যদি তাই হয়, তাহলে কোটি কোটি টাকার পৌর ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন কী? শহরের প্রবীণ বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, একসময় শিলচরে এমন পরিস্থিতি এত ভয়াবহ ছিল না। জনসংখ্যা বেড়েছে, শহরের বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি পরিকাঠামো।

অনেকেই এখন পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন, নাগরিকদের সিভিক সেন্স নিয়ে এত কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু প্রশাসনের নিজের সিভিক সেন্স কোথায়? বর্ষার আগে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া কি প্রশাসনের দায়িত্ব নয়? নিয়মিত আবর্জনা অপসারণ, ড্রেন পরিষ্কার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, কার্যকর নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এগুলো কি সাধারণ মানুষের কাজ? বাস্তব এটাই, বৃষ্টি হলেই যদি শহর নদীতে পরিণত হয়, তবে তা নিছক নাগরিক অসচেতনতার কারণে নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার জীবন্ত ও লজ্জাজনক প্রমাণ।

আজ শিলচরের মানুষ ক্লান্ত, বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ। তাঁরা এখন সরাসরি জানতে চাইছেন, ছয় বছর ধরে পুরনিগম নির্বাচন কেন হয়নি? জলনিকাশীর জন্য বরাদ্দ কোটি কোটি টাকা কোথায় খরচ হলো? বর্ষার আগে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি? প্রতি বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি কেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়ে শুধুমাত্র “সিভিক সেন্স”শব্দটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।

Related Posts

কাটিগড়ায় বরাকের তাণ্ডবে গৃহহীন বহু পরিবার

মাদারপুরে নদীগর্ভে তলিয়ে গেল ১০টি পরিবারের ভিটেমাটি, বাড়িঘর হারিয়ে আশ্রয় শিবিরে, আতঙ্কে নির্ঘুম গোটা এলাকা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ মেঃ কাটিগড়ার মাদারপুরে আবারও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে বরাক নদী। গোবিন্দপুরের…

বরাকের করাল গ্রাসে ঐতিহ্যবাহী কাটিগড়ার কপিলাশ্রম

নদীভাঙনে তলিয়ে গেল মন্দির প্রাঙ্গণের দুইশ মিটার অংশ, স্থায়ী সমাধানের দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে সরব কমিটি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ মেঃ বরাক নদীর ভয়াবহ ভাঙন যেন ক্রমশ গিলে খাচ্ছে একের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *