ছয় বছর পুরভোট নেই, জলনিকাশী ভেঙে পড়েছে, তবুও সিভিক সেন্সের অজুহাতের আড়ালে প্রশাসনের দায় এড়ানোর অভিযোগ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ মেঃ এক পশলা বৃষ্টি। সময় মাত্র আধঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টা। আর তাতেই যেন থমকে যায় পুরো শহর। রাস্তাঘাট মুহূর্তে পরিণত হয় নোংরা জলের খালে। নর্দমার পচা জল উপচে ঢুকে পড়ে মানুষের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে। যান চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বাজারে ব্যবসা বন্ধ হয়। অফিসযাত্রী থেকে স্কুলপড়ুয়া সবাইকে হাঁটু সমান জল মাড়িয়ে চলতে হয় গন্তব্যে। অসুস্থ রোগী নিয়ে ছুটে চলা অ্যাম্বুল্যান্সও আটকে পড়ে জলমগ্ন রাস্তায়।
বরাক উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র শিলচরের এই দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং এক নির্মম বাস্তবতা। প্রতিবারের মতো এবারও শহরবাসী জলবন্দি হওয়ার পর শুরু হয়েছে দায় এড়ানোর রাজনীতি। প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনার দায় স্বীকার না করে কিছু শাসকঘনিষ্ঠ নেতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মহল আবারও সেই পুরনো সুরে বলছেন, মানুষ প্লাস্টিক ফেলছে বলেই ড্রেন বন্ধ হচ্ছে, নাগরিকদের সিভিক সেন্স নেই, সচেতনতার অভাবেই শহরের এই দুর্দশা।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সত্যিই কি শুধু সাধারণ মানুষই দায়ী? কোটি কোটি টাকার পৌর বাজেট, আধুনিক নগরোন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক পরিকাঠামো সবকিছু থাকার পরও যদি এক পশলা বৃষ্টিতে শহর ডুবে যায়, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় কাদের কাঁধে বর্তায়? বাস্তবতা হলো, “সিভিক সেন্স”শব্দটিকে এখন অনেকেই প্রশাসনের একটি সুবিধাজনক ঢাল হিসেবে দেখছেন।
যখনই জলাবদ্ধতা, অপরিষ্কার নর্দমা, রাস্তার বেহাল দশা বা নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখনই সাধারণ মানুষের ওপর দায় চাপিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়। অথচ শহরের মানুষ বছরের পর বছর নিয়মিত কর দিয়ে চলেছেন। হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, বিভিন্ন পৌর ফি সবকিছুই সময়মতো আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু বিনিময়ে নাগরিকরা কী পাচ্ছেন? পাচ্ছেন ভাঙাচোরা রাস্তা, জলমগ্ন অলিগলি, মশার উপদ্রব, আবর্জনার স্তূপ, দুর্গন্ধে ভরা নর্দমা আর চরম প্রশাসনিক উদাসীনতা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যে শহরে গত ছয় বছর ধরে পুরনিগম নির্বাচনই হয়নি, সেখানে প্রশাসন কোন নৈতিকতায় নাগরিকদের ‘সিভিক সেন্স’শেখায়? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি শহরের মানুষ নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার রাখেন। কিন্তু শিলচরের মানুষ সেই অধিকার থেকেও দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত। নির্বাচিত বোর্ড না থাকায় জনগণের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ এমন কোনো জনপ্রতিনিধি কার্যত নেই। ফলে নাগরিক সমস্যাগুলোরও যেন কোনো জবাবদিহি নেই।

শহরের বহু বাসিন্দার অভিযোগ, বর্ষার আগে ড্রেন পরিষ্কারের নামে প্রতি বছর কাজ দেখানো হলেও বাস্তবে তার প্রভাব চোখে পড়ে না। সামান্য বৃষ্টিতেই যদি প্রধান প্রধান সড়ক ডুবে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আদৌ কি সঠিকভাবে নর্দমা পরিষ্কার করা হয়েছিল? জলনিকাশীর রুট কি কার্যকর রাখা হয়েছিল? নাকি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকেছে প্রস্তুতি?
শুধু তাই নয়, শহরের একাধিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং নিকাশি পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নালা-নর্দমা বুজিয়ে গড়ে উঠেছে স্থাপনা। কিন্তু প্রশাসনের তরফে কার্যকর পদক্ষেপ খুব কমই দেখা যায়। ফলে বর্ষা এলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শহরের সচেতন নাগরিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি শহরের জলনিকাশি ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত যাতে স্বল্প থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাতেও জল দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু শিলচরে সেই মৌলিক নগর পরিকল্পনারই যেন চরম অভাব। শহরের বহু ড্রেন বছরের পর বছর সংস্কার হয়নি। কোথাও পর্যাপ্ত ঢাল নেই, কোথাও আবার নর্দমা সরাসরি আবর্জনায় ভরে রয়েছে। ফলে বৃষ্টির জল বের হওয়ার পথই খুঁজে পায় না।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে দায়ী করার প্রবণতা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে শহরজুড়ে। নাগরিকদের একাংশ প্লাস্টিক ফেলেন, এটা অবশ্যই ভুল এবং নিন্দনীয়। কিন্তু একটি গোটা শহরের জলনিকাশি ব্যবস্থা কি কয়েকটি প্লাস্টিক ব্যাগের কারণে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে? যদি তাই হয়, তাহলে কোটি কোটি টাকার পৌর ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন কী? শহরের প্রবীণ বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, একসময় শিলচরে এমন পরিস্থিতি এত ভয়াবহ ছিল না। জনসংখ্যা বেড়েছে, শহরের বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি পরিকাঠামো।
বরং পরিকল্পনাহীন নগরায়ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফল ভুগছেন সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত দুর্ভোগের পরও শিলচরের মানুষ এখনও ধৈর্য ধরে আছেন। কোথাও ব্যাপক ভাঙচুর নেই, প্রশাসনিক অফিসে হামলা নেই, আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও নেই। মানুষ বারবার সমস্যা সহ্য করছেন শুধুমাত্র এই আশায় যে, হয়তো এবার পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। কিন্তু সেই সহনশীলতাকেই যদি দুর্বলতা মনে করা হয়, তাহলে তা হবে প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ভুল।
অনেকেই এখন পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন, নাগরিকদের সিভিক সেন্স নিয়ে এত কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু প্রশাসনের নিজের সিভিক সেন্স কোথায়? বর্ষার আগে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া কি প্রশাসনের দায়িত্ব নয়? নিয়মিত আবর্জনা অপসারণ, ড্রেন পরিষ্কার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, কার্যকর নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এগুলো কি সাধারণ মানুষের কাজ? বাস্তব এটাই, বৃষ্টি হলেই যদি শহর নদীতে পরিণত হয়, তবে তা নিছক নাগরিক অসচেতনতার কারণে নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার জীবন্ত ও লজ্জাজনক প্রমাণ।
আজ শিলচরের মানুষ ক্লান্ত, বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ। তাঁরা এখন সরাসরি জানতে চাইছেন, ছয় বছর ধরে পুরনিগম নির্বাচন কেন হয়নি? জলনিকাশীর জন্য বরাদ্দ কোটি কোটি টাকা কোথায় খরচ হলো? বর্ষার আগে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি? প্রতি বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি কেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়ে শুধুমাত্র “সিভিক সেন্স”শব্দটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।
কারণ মানুষ এখন আর শুধুমাত্র আশ্বাস শুনতে রাজি নন। তাঁরা চান কার্যকর প্রশাসন, জবাবদিহিমূলক পুরব্যবস্থা এবং স্থায়ী সমাধান। শিলচরের মানুষ পরিষ্কার রাস্তা চান। চান কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। চান বৃষ্টির জলমুক্ত স্বাভাবিক শহুরে জীবন। আর সবচেয়ে বড় কথা, তাঁরা চান দায়িত্ব এড়িয়ে সাধারণ মানুষকে অপমান করার এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান ঘটুক। কারণ নাগরিকদের ধৈর্যকে বারবার পরীক্ষা করা যায়, কিন্তু চিরকাল অবহেলা করা যায় না।






