নদীভাঙনে তলিয়ে গেল মন্দির প্রাঙ্গণের দুইশ মিটার অংশ, স্থায়ী সমাধানের দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে সরব কমিটি
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ মেঃ বরাক নদীর ভয়াবহ ভাঙন যেন ক্রমশ গিলে খাচ্ছে একের পর এক জনপদ, ধর্মীয় স্থাপনা ও মানুষের স্মৃতি-বিজড়িত ঐতিহ্য। গোবিন্দপুর ও মাদারপুরের পর এবার নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় দাঁড়িয়ে বরাক উপত্যকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মস্থান কাটিগড়ার বদরপুর ঘাট সংলগ্ন শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দির তথা কপিলাশ্রম শিববাড়ী। শুক্রবার হঠাৎ করেই ভয়ঙ্কর ভূমিক্ষয়ের ঘটনায় মন্দির প্রাঙ্গণের একটি বৃহৎ অংশ নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে মন্দিরের পাকা বাথরুম, সঙ্গে নদীর গর্ভে হারিয়ে যায় বহু বাঁশঝাড়, কদমগাছসহ বিভিন্ন মূল্যবান বৃক্ষ এবং প্রায় দুইশ মিটার এলাকা।
স্থানীয়দের বক্তব্য, চলতি বর্ষায় এখনও বরাক নদীর জলস্ফীতি তেমন ভয়াবহ আকার ধারণ না করলেও অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে নদীর তীরভাঙন ও ভূমিধসের ঘটনা। প্রতিদিনই মাটি ধসে পড়ছে নদীতে। আর সেই দৃশ্য চোখের সামনে দেখে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন কপিলাশ্রম এলাকার বাসিন্দারা। শুক্রবার দুপুরের পর আচমকাই বিকট শব্দে নদীর পাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে নদীতে। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। স্থানীয়রা ছুটে এসে দেখেন, মন্দির প্রাঙ্গণের পাকা নির্মাণ নদীর জলে বিলীন হয়ে গেছে।

বরাক উপত্যকার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে কপিলাশ্রম শিববাড়ীর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বহু বছর ধরে এই মন্দিরে প্রতিদিন পূজা-অর্চনা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং শিবরাত্রি উপলক্ষে হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে। শুধু কাটিগড়া নয়, কাছাড় জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন পূণ্য লাভের আশায়। সেই ঐতিহ্যবাহী ধর্মস্থান আজ নদীভাঙনের করাল গ্রাসে দাঁড়িয়ে থাকায় গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে ভক্তমহল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা এলেই বরাক নদীর ভাঙন ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অস্থায়ীভাবে বালির বস্তা বা মাটি ফেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা আজও গ্রহণ করা হয়নি। ফলে বছর ঘুরতেই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে কপিলাশ্রম শিববাড়ীর মতো ঐতিহাসিক ধর্মস্থানও।
মন্দির পরিচালনা সমিতির সম্পাদক সুজন ভট্টাচার্য গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে মন্দিরের মূল অংশও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শুক্রবার যে ক্ষতি হয়েছে, তা কেবল একটি বাথরুম বা কিছু গাছপালা হারানোর ঘটনা নয়, বরং একটি ঐতিহ্য ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হওয়ার অশনিসংকেত। আমরা চাই সরকার দ্রুত স্থায়ী নদীভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে।
বরাক উপত্যকার জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসন এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছেন মন্দির কমিটির সদস্যরা। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে জিওব্যাগ, পাথর ফেলা, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণসহ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নদীভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় আগামী দিনে আরও বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, অতীতে বরাক নদীর গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণে বদরপুর ঘাট সংলগ্ন বহু এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদীভাঙনের গতি যেভাবে বেড়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে শুধু মন্দির নয়, আশপাশের বহু বসতবাড়িও ঝুঁকির মুখে পড়বে। এদিকে ঘটনাস্থলে বহু মানুষ ভিড় জমিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। নদীর পাড়ে ফাটল দেখা দেওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অনেকেই বলছেন, বরাকের ভয়াল থাবা এখন আর কেবল নদীপারের মানুষের জমিজমা কেড়ে নিচ্ছে না, ধীরে ধীরে গ্রাস করছে উপত্যকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকেও। এখন প্রশ্ন উঠছে, প্রতিবছর একইভাবে নদীভাঙনে মানুষ সর্বস্ব হারানোর পরও কেন গৃহীত হচ্ছে না স্থায়ী সমাধান? কেন এখনও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প? কপিলাশ্রম শিববাড়ীর এই ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ফের একবার প্রশাসনের ভূমিকা ও নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিল বলেই মত সচেতন মহলের।





