পুকুরসম গর্ত, কাদা আর জমাজলে বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ মেঃ কালাইন বাজারের প্রধান সড়ক এখন আর শুধু একটি রাস্তা নয়, এটি যেন দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অবহেলা, দায়িত্বহীনতা ও জনদুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বরাক উপত্যকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, রোগী নিয়ে চলা অ্যাম্বুলেন্স, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী সবাইকে প্রতিদিন এই রাস্তার দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার বিভিন্ন অংশ ভেঙে গিয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সেখানে জল জমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে বাইক ও স্কুটি চালকদের জন্য এই রাস্তা এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুবার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হলেও এখনো পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমাধানের উদ্যোগ দেখা যায়নি। এলাকাবাসীর মতে, প্রতি বছর রাস্তা সংস্কারের জন্য সরকারি বরাদ্দ এলেও বাস্তবে কাজের মান খুবই খারাপ। কিছুদিন কাজ চলার পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় রাস্তা। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। পাশাপাশি ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমস্যার কারণেও সামান্য বৃষ্টিতে বাজার এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ছে।

রাস্তার বুকে এখন অসংখ্য বড় বড় গর্ত। কোথাও পিচ উঠে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে ধারালো পাথর, কোথাও আবার হাঁটুসমান কাদা জমে তৈরি হয়েছে মৃত্যুফাঁদ। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা পরিণত হচ্ছে ছোট ছোট জলাশয়ে। কোনটা গর্ত আর কোনটা রাস্তা তা বোঝাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বাইক ও স্কুটি আরোহীদের কাছে এই রাস্তা এখন আতঙ্কের আরেক নাম। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।
কেউ পড়ে গিয়ে আহত হচ্ছেন, কারও গাড়ির ক্ষতি হচ্ছে, আবার কেউ অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে ফিরছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এতকিছুর পরেও প্রশাসনের টনক নড়ছে না। এলাকাবাসীর ক্ষোভ আরও বেড়েছে কারণ এই রাস্তার দুরবস্থা নতুন নয়। বহুবার সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমেও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট বিভাগ যেন সব দেখেও না দেখার ভান করছে। প্রশ্ন উঠছে, কাদের ছত্রছায়ায় বছরের পর বছর ধরে এমন নিম্নমানের কাজ করে পার পেয়ে যাচ্ছে ঠিকাদার সংস্থাগুলি?
স্থানীয়দের দাবি, প্রতি বছরই রাস্তা সংস্কারের নামে সরকারি বরাদ্দ আসে। কিন্তু বাস্তবে যা হয়, তা যেন এক পুরনো চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি। কয়েকদিন সামান্য মেরামতির কাজ হয়, কিছু পাথর ফেলে বা অল্প পিচ ঢেলে ছবি তোলা হয়, তারপর কাজ বন্ধ। কিছুদিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় রাস্তা। অথচ ঠিকাদারদের বিল ঠিকই পাস হয়ে যায়। এতে জনমনে তৈরি হয়েছে তীব্র সন্দেহ। সাধারণ মানুষের সরাসরি প্রশ্ন, কাজের মান যাচাই না করেই কীভাবে বিল পাস হয়?
সরকারি প্রকৌশলী ও বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা কি আদৌ কাজ পরিদর্শনে আসেন? যদি এসে থাকেন, তাহলে এই বেহাল চিত্র তাঁদের চোখে পড়ে না কেন? সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নিম্নমানের কাজের অভিযোগ ওঠার পরও এখনো পর্যন্ত কোনো ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কাউকে ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়নি, কোনো তদন্তের কথাও সামনে আসেনি। ফলে জনমনে ধারণা আরও জোরালো হচ্ছে যে, পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই কোথাও না কোথাও গভীর গলদ রয়েছে।
রাস্তার পাশাপাশি ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবস্থা যেন আরও ভয়ঙ্কর। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বাজার এলাকায় পূর্বে নির্মিত বহু ড্রেন সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিকভাবে তৈরি করা হয়েছে। কোথা থেকে ড্রেন শুরু হবে, কোথায় গিয়ে শেষ হবে, কীভাবে জল নিষ্কাশন হবে, এই মৌলিক বিষয়গুলির প্রতিই নাকি কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বহু জায়গায় দেখা গেছে, ড্রেন মাঝপথে শুরু হয়ে আবার মাঝপথেই শেষ হয়ে গেছে। কোথাও কোনো নির্দিষ্ট আউটলেট নেই, কোথাও জল গিয়ে আটকে পড়ছে।
ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জল জমে বাজার এলাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, ড্রেনগুলো কার্যকর হওয়ার বদলে উল্টে জলাবদ্ধতার সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে রাস্তার ক্ষয়ক্ষতিও বেড়েছে বহুগুণ। অনেকের মতে, পরিকল্পনাহীন এই কাজ আসলে সরকারি অর্থের অপচয়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। প্রথমে ভুলভাবে ড্রেন নির্মাণ, তারপর আবার তা সংস্কারের নামে নতুন বরাদ্দ এই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে এখন উঠছে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন।
আরও বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে আরসিসি ড্রেন সংস্কার কাজকে ঘিরে। জানা গেছে, সংস্কারের জন্য বরাদ্দ অর্থের কাজ শুরু হলেও মাত্র এক-দুদিন কয়েকজন শ্রমিক কাজ করার পর হঠাৎ করেই সব বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে আর কোনো কাজ হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই কাজের সঙ্গে বাজার এলাকার এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর নামও জড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সরকারি প্রকল্পে একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর ভূমিকা কী? তিনি কি ঠিকাদার? নাকি অন্য কোনোভাবে কাজের উপর প্রভাব খাটানো হয়েছে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন বরাদ্দ অর্থ নিয়ে। স্থানীয়দের একাংশের আশঙ্কা, কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই কি পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে? নাকি টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে? যদি তা না হয়, তাহলে সেই বরাদ্দ অর্থ এখন কোথায়? এই সমস্ত প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর আজও মেলেনি। ফলে মানুষের ক্ষোভ ধীরে ধীরে অবিশ্বাসে পরিণত হচ্ছে। এদিকে, গত ১৫ মে ভাটপাড়ায় সংবাদমাধ্যমের সামনে বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ ঘোষণা করেছেন যে, কালাইন এলাকায় শীঘ্রই একটি মাস্টার ড্রেনেজ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
ঘোষণার পর সাময়িক আশার সঞ্চার হলেও সাধারণ মানুষের একাংশ বলছেন, শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তব কাজ দেখতে চান তাঁরা। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা তাঁদের আশাবাদী হতে দিচ্ছে না। বহু প্রতিশ্রুতি এসেছে, কিন্তু বাস্তবের মাটিতে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা গেছে।

আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, এই বেহাল রাস্তার কারণে যদি আগামী দিনে কোনো প্রাণহানি ঘটে, তাহলে তার দায় কে নেবে? সেটিকে কি শুধুই দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া হবে? নাকি দীর্ঘদিনের অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং নিম্নমানের কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক গাফিলতির অভিযোগ উঠবে? কালাইনবাসীর দাবি এখন স্পষ্ট ও জোরালো। অবিলম্বে পুরো রাস্তার বৈজ্ঞানিক সংস্কার করতে হবে। পরিকল্পিত ও কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অতীতে রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণে যে বরাদ্দ অর্থ খরচ হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
পাশাপাশি নিম্নমানের কাজের সঙ্গে জড়িত ঠিকাদার, দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক এবং প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও উঠেছে। কারণ সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই, জনগণের করের টাকায় যদি জনগণই নিরাপদ রাস্তা না পায়, তাহলে সেই উন্নয়নের আসল অর্থ কোথায়? এখনই যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে কালাইনের এই রাস্তা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। আর তখন দায় এড়ানোর সুযোগ হয়তো আর থাকবে না।





