বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৫ মেঃ লক্ষীপুর যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এক শোকস্তব্ধ জনপদে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছে গোটা এলাকা। কারও মৃত্যু দীর্ঘদিনের মারণরোগে, আবার কারও মৃত্যু হঠাৎ করেই যাত্রাপথে। একের পর এক পরিচিত মুখ হারিয়ে আজ শোকের ছায়া নেমে এসেছে লক্ষীপুর শহর ও সংলগ্ন এলাকাগুলিতে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী সবার চোখেই এখন জল, মুখে একটাই কথা, এত মৃত্যু একসঙ্গে কীভাবে মেনে নেওয়া যায়?
সম্প্রতি প্রাণ হারিয়েছেন গোসাইনগরের কেশব দাস, ফুলেরতলের ব্যবসায়ী গণেশ রায়, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হিতেশ রায়ের স্ত্রী, ফরেস্ট অফিস এলাকার শিক্ষক প্রীতিরাজ দাস এবং ছোটমামদার জনপ্রিয় শিক্ষক রামকেওল কুর্মি। তাঁদের মধ্যে অন্তত তিনজন দীর্ঘদিন ধরে কর্কট রোগে ভুগছিলেন। তবে প্রত্যেক মৃত্যুই এলাকাবাসীর মনে গভীর শোক ও নাড়া দিয়ে গেছে।
গোসাইনগরের বাসিন্দা কেশব দাসের জীবন যেন থেমে গেল খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। বিয়ের পর সংসার জীবনের খুব বেশি বছরও কাটেনি। সন্তানহীন ছোট্ট সংসারে স্ত্রীকে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবেই দিন কাটছিল তাঁর। স্থানীয়দের কথায়, কেশব ছিলেন সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ। হঠাৎ করেই শরীরে দুর্বলতা দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তিনি। নানা পরীক্ষার পর ধরা পড়ে মারণরোগ।
এরপর চিকিৎসকদের পরামর্শে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শেষরক্ষা হয়নি। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। তাঁর অকাল মৃত্যুতে গোসাইনগর এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। অন্যদিকে লক্ষীপুর শহরের ফুলেরতল এলাকার পরিচিত ব্যবসায়ী হিতেশ রায়ের পরিবারেও নেমে এসেছে গভীর শোক। কয়েক বছর ধরেই তাঁর স্ত্রী কর্কট রোগে আক্রান্ত ছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন চিকিৎসা চললেও সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যুর কাছে হার মানেন। বর্তমানে পরিবারে রয়েছেন স্বামী হিতেশ রায়, এক পুত্র, পুত্রবধূ এবং বিবাহিত কন্যা। তাঁর মৃত্যুতে আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।
ফুলেরতলেরই আরেক পরিচিত মুখ গণেশ রায়। পেশায় ব্যবসায়ী গণেশবাবুও কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরিবারের সদস্যদের চোখের সামনেই ধীরে ধীরে নিভে যায় তাঁর জীবনের প্রদীপ। ঘরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় শোকের আবহ নেমে আসে।
একইভাবে লক্ষীপুর শহরের ফরেস্ট অফিস এলাকার বাসিন্দা শিক্ষক প্রীতিরাজ দাসের মৃত্যু এলাকাবাসীকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিচিত ও সম্মানিত মুখ ছিলেন তিনি। কর্কট রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। কিন্তু সুস্থ হয়ে আর ফেরা হয়নি তাঁর। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই পরিবার ও প্রিয়জনদের কাঁদিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। পরিবারে রেখে গিয়েছেন স্ত্রী ও সন্তানদের।
প্রিয় শিক্ষক রামকেওল কুর্মির আকস্মিক মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেন গুণমুগ্ধরা
তবে এই একের পর এক মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে ছোটমামদার শিক্ষক রামকেওল কুর্মির মৃত্যু। শুধু শিক্ষক হিসেবেই নয়, মানবিকতা ও সাহায্যপ্রবণতার জন্য এলাকায় আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ছোটমামদা এলপি স্কুলের শিক্ষক রামকেওলবাবু ছিলেন সবার প্রিয় সহায়্যকারী মানুষ। এলাকার যে কোনও সমস্যা, অসুস্থতা, দুঃসময় বা আর্থিক সংকটে তিনি দুহাত বাড়িয়ে সাহায্য করতেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে বিশেষ সম্মান অর্জন করেছিলেন। জানা গেছে, সম্প্রতি তিনি গুয়াহাটিতে গিয়েছিলেন।

সেখানে গিয়েই শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করেন। সাময়িক চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থতা ফিরে পেলেও আর হাসপাতালে ভর্তি হতে রাজি হননি। বরং দ্রুত বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। পরে ট্রেনে শিলচরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। সহযাত্রীদের সঙ্গে গল্পগুজবের পর এসি কামরার নিজের সিটে ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আচমকাই সিট থেকে নিচে পড়ে যান তিনি। তখনই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ধরা পড়ে। পরে ট্রেন শিলচর স্টেশনে পৌঁছলে সঙ্গীরা তাঁকে নিয়ে যান শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
মরণোত্তর পরীক্ষার পর তাঁর মৃতদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হলে ছোটমামদা এলাকায় নেমে আসে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বহু মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন। কারণ শিক্ষকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে রামকেওল কুর্মি ছিলেন এলাকার মানুষের ভরসার নাম। সন্তান না থাকলেও আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদেরই নিজের পরিবার বলে মনে করতেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজনীতির প্রতিও গভীর আগ্রহ ছিল তাঁর। চাকরির আর মাত্র কয়েক মাস বাকি ছিল।
পরিচিত মহলে তিনি প্রায়ই বলতেন, অবসর গ্রহণের পর সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—সেই স্বপ্ন আর পূরণ হল না। একসঙ্গে এতগুলি মৃত্যুর ঘটনায় আজ শোকাহত লক্ষীপুর। প্রতিদিন কোনও না কোনও বাড়িতে শোকের মাতম, কান্নার শব্দ আর শেষ বিদায়ের দৃশ্য যেন এলাকার মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, এ যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে লক্ষীপুর।






