লক্ষীপুরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র! সরকারি হাসপাতালের গাফিলতিতে প্রাণ গেল নবজাতকের? প্রশ্নের মুখে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে জয়পুর হাসপাতাল। শনিবার সকালে প্রসব যন্ত্রণা ওঠায় নিজের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে যান জয়পুর এলাকার বাসিন্দা রাজু পাল। পরিবারের দাবি, নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শেই এতদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন তাঁর স্ত্রী। মাত্র দুদিন আগেও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেছিলেন হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক। সেই বিশ্বাস নিয়েই শনিবার সকালে প্রসূতিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, এরপরই শুরু হয় চরম অবহেলা ও গাফিলতির এক নির্মম অধ্যায়। মৃত নবজাতকের বাবা রাজু পালের দাবি, হাসপাতালে সেই সময় একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক উপস্থিত থাকলেও কিছুক্ষণ পর তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ, চিকিৎসক সিএইচও রয়েছেন বলে জানিয়ে অটো রিকশায় অন্যত্র চলে যান। এদিকে প্রসূতির প্রসব যন্ত্রণা ক্রমশ বাড়তে থাকলেও পরিবার বারবার চিকিৎসককে ডাকার অনুরোধ জানিয়েও কোনো সাড়া পাননি বলে অভিযোগ।

পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। অবশেষে প্রসবের সময় মৃত অবস্থায় জন্ম নেয় নবজাতকটি। মৃত সন্তানকে দেখে ভেঙে পড়েন অসহায় বাবা রাজু পাল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার স্ত্রী নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানেই ছিল। যদি আগে থেকে কোনো সমস্যা থাকত, তাহলে আমাদের অবশ্যই জানানো হতো। কিন্তু সবকিছু স্বাভাবিক বলেই আশ্বস্ত করা হয়েছিল। আজ হাসপাতালে ভর্তি করার পর যখন সবচেয়ে বেশি চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল, তখন ডাক্তারকেই পাওয়া গেল না।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পেলে আমার সন্তান আজ বেঁচে থাকত। ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকদের অবহেলা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণেই একটি তাজা প্রাণ অকালে ঝরে গেল। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

তিনি আরও বলেন, সন্তান হারানোর শোকের মধ্যেও স্ত্রীকে নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছেন। যদিও বর্তমানে প্রসূতি শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন বলে জানা গেছে, তবে মানসিকভাবে পুরো পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজুর প্রশ্ন, একজন চিকিৎসক যদি রোগীকে ফেলে চলে যান, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? সরকারি হাসপাতাল কি শুধুই নামেই চলছে? ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।

হাসপাতালে জড়ো হয়ে তাঁরা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। স্থানীয়দের বক্তব্য, চিকিৎসকরা মানুষের কাছে ভগবানের সমতুল্য। কিন্তু যদি সেই চিকিৎসকরাই দায়িত্ব এড়িয়ে যান, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবন কোথায় নিরাপদ? বিক্ষোভকারীদের একাংশের অভিযোগ, জয়পুর হাসপাতালের স্বাস্থ্য পরিষেবা দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল। পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, রাতের বেলায় রোগীদের দেখার কেউ থাকে না, জরুরি পরিষেবা প্রায় অচল। বহু সময় রোগীদের শিলচর বা অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

এক প্রতিবাদকারী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, সরকার স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নয়নের বড় বড় দাবি করলেও গ্রামের হাসপাতালগুলোর বাস্তব চিত্র ভয়াবহ। একজন অন্তঃসত্ত্বা মায়ের পাশে যদি প্রয়োজনের সময় ডাক্তার না থাকেন, তাহলে এই হাসপাতালের অস্তিত্বের মানে কী? ঘটনার পর হাসপাতাল চত্বরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জয়পুর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।

পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালায় এবং পরিবারকে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপের আশ্বাস দেয় বলে জানা গেছে। তবে সংবাদ লেখা পর্যন্ত অভিযুক্ত চিকিৎসক কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এই নীরবতাই আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে স্থানীয়দের। তাঁদের প্রশ্ন, যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি না থাকে, তাহলে ঘটনার পর কেন মুখ খুলছেন না দায়িত্বশীলরা?

এই ঘটনাকে ঘিরে এখন নতুন করে সামনে এসেছে গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভয়াবহ সংকট। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকা, জরুরি মুহূর্তে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া, প্রসূতি পরিষেবার দুর্বল অবস্থা সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম অনাস্থা তৈরি হচ্ছে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর। এক নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ ঘিরে জয়পুর আজ শোকাহত, ক্ষুব্ধ এবং আতঙ্কিত। প্রশ্ন একটাই, এই মৃত্যুর দায় নেবে কে? আর কত প্রাণ গেলে নড়েচড়ে বসবে স্বাস্থ্য দপ্তর?

Related Posts

কাটিগড়ায় বরাকের তাণ্ডবে গৃহহীন বহু পরিবার

মাদারপুরে নদীগর্ভে তলিয়ে গেল ১০টি পরিবারের ভিটেমাটি, বাড়িঘর হারিয়ে আশ্রয় শিবিরে, আতঙ্কে নির্ঘুম গোটা এলাকা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ মেঃ কাটিগড়ার মাদারপুরে আবারও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে বরাক নদী। গোবিন্দপুরের…

বরাকের করাল গ্রাসে ঐতিহ্যবাহী কাটিগড়ার কপিলাশ্রম

নদীভাঙনে তলিয়ে গেল মন্দির প্রাঙ্গণের দুইশ মিটার অংশ, স্থায়ী সমাধানের দাবিতে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে সরব কমিটি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ মেঃ বরাক নদীর ভয়াবহ ভাঙন যেন ক্রমশ গিলে খাচ্ছে একের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *