বই-খাতা থেকে পোশাকের চড়া দাম, শিক্ষার দোহাই দিয়ে পকেট কাটার কড়া সমালোচনা, উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৮ আগষ্টঃ শিক্ষার প্রসার নাকি ব্যবসার পশার? কাটিগড়া সমষ্টির অন্তর্গত কালাইন ও তার আশপাশের এলাকায় দিন দিন মাশরুমের মতো গজিয়ে ওঠা একাধিক বেসরকারি স্কুলের ভূমিকা নিয়ে এখন তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অভিভাবকদের এক বড় অংশের অভিযোগ, নতুন নতুন বিদ্যালয় খুললেও সেগুলির অধিকাংশতেই নেই ন্যূনতম পরিকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক কিংবা সরকারি অনুমোদন। শিক্ষার মান উন্নয়ন এর চটকদার বিজ্ঞাপনকে পুঁজি করে কোটি টাকার বাণিজ্যিক কারবার চালানো হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ফলে ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ এবং অভিভাবকদের পকেটের ওপর তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
অভিযোগের পাহাড় জমেছে কালাইনের একাধিক নবগঠিত বেসরকারি স্কুলের বিরুদ্ধে। সরকারি অনুমোদন পাওয়ার সময় শিক্ষা দপ্তরের কাছে জেনারেটর, পর্যাপ্ত পানীয় জল, উন্নত শ্রেণিকক্ষ, সুসজ্জিত শৌচাগার এবং অভিজ্ঞ শিক্ষক মণ্ডলীর যে দীর্ঘ ডিক্লারেশন’জমা দেওয়া হয়, বাস্তব পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে যখন শিশুরা হাঁসফাঁস করে, তখন অনেক স্কুলেই জেনারেটর চালানো হয় না বলে অভিযোগ। বিকল্প বিদ্যুৎ পরিষেবা না থাকায় বন্ধ ঘরে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তাছাড়া, দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অনগ্রসর শ্রেণির শিশুদের জন্য সরকারি নির্দেশিকা মেনে নিখরচায় আসন বরাদ্দ রাখার যে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ বাস্তবে তার কোনো সুফল মিলছে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগটি উঠেছে শিক্ষার গুণগত মান ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যোগ্যতা নিয়ে। খরচ বাঁচাতে গিয়ে অতি কম বেতনে অনভিজ্ঞ ও অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ করছে কয়েকটি স্কুল কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক স্তরে যেখানে শিশুর গণিত, ভাষা ও সাধারণ জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি হয়, সেখানে শিক্ষকের অজ্ঞতার কারণে ভুল প্রশ্ন ও ভুল উত্তর শিশুদের খাতায় লিখে দেওয়া হচ্ছে! অভিভাবকেরা নিজেরা পর্যাপ্ত শিক্ষিত না হওয়ায় স্কুলের ওপর ভরসা করেই সন্তানদের পাঠান। কিন্তু ভুল শিক্ষা দিয়ে শিশুদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সচেতন মহলে চরম আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
একই শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর কেন নতুন করে রি-অ্যাডমিশন বা পুনঃভর্তির ফি দিতে হবে? এই প্রশ্ন এখন প্রতি ঘরে। সুপ্রিম কোর্ট ও শিক্ষা দপ্তরের কড়া নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও প্রমোশনের নামে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুধু পুনঃভর্তি ফি-ই নয়, নির্ধারিত দোকান থেকে চড়া দামে বই, খাতা, কলম ও ইউনিফর্ম কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে অভিভাবকদের। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
স্কুল চলাকালীন খুদে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিয়েও দেখা দিয়েছে চরম গাফিলতি। শ্রেণিকক্ষে বা খেলার মাঠে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মারামারি বা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে কিংবা কোনো শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে স্কুল কর্তৃপক্ষ সময়মতো অভিভাবকদের জানায় না বলে অভিযোগ। ঘটনা গোপন রাখার এই প্রবণতা যেকোনো দিন বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
কালাইনের সামগ্রিক শিক্ষা পরিবেশ রক্ষায় অবিলম্বে শিক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে একটি নিরপেক্ষ ও সমাকলিত পরিদর্শনের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী অভিভাবক ও স্থানীয় সুশীল সমাজ। প্রতিটি স্কুলের সরকারি স্বীকৃতি, শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত, শিক্ষক সমূহের শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ফি কাঠামোর স্বচ্ছতা সরেজমিনে পরীক্ষা করার জোর দাবি উঠেছে।
কালাইন—বরাক উপত্যকার এক অপেক্ষাকৃত প্রান্তিক অঞ্চল। যেখানে নতুন ভোরের আলো ফোটে অজস্র তরুণ চোখের অদম্য স্বপ্ন নিয়ে, সেখানে শিক্ষার সুযোগ প্রসারের খবর স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তির বাতাস বয়ে আনার কথা। কিন্তু সেই সুযোগ যদি প্রকৃত শিক্ষাদানের বদলে কেবলই অর্থ উপার্জনের মদ্যপ মেশিনে পরিণত হয়, তবে তা উদ্বেগের জন্ম দেয়।
অভিযোগের তির যাদের দিকে, তাঁদের পক্ষ ও বক্তব্য জানা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা নিশ্চয়ই আইনি ও নীতিগত প্রক্রিয়ার একটি আবশ্যিক অংশ। একপাক্ষিক বিচার কখনো সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে না। কিন্তু সমস্ত নিয়ম-নীতি আর নথিপত্রের আড়ালে দাঁড়িয়ে যে প্রশ্নটি আজ বরাক উপত্যকার আকাশ-বাতাসকে ভারী করে তুলেছে, তা হলো, শিক্ষার মতো একটি পবিত্র ক্ষেত্র কি শেষ পর্যন্ত শুধুই মুনাফা লাভের ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত হতে চলেছে?
শিক্ষা কোনো কেনাবেচার বস্তু নয়, শিক্ষা হলো মানবসম্পদ নির্মাণের এক পরম সাধনা। কিন্তু কালাইনের মতো অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে যদি বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রাধান্য পেতে শুরু করে, তবে তার সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ মাশুল গুনতে হবে আমাদের আগামী প্রজন্মকে। আজ কালাইনবাসীর সুর একটাই, প্রান্তিক এই অঞ্চলে নতুন নতুন স্কুল, কলেজ কিংবা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠুক, বৃদ্ধি পাক মেধা বিকাশের সুযোগ।
শিক্ষার পবিত্র অঙ্গন যেন কোনো অবস্থাতেই কেবল অর্থ উপার্জনের হাটে রূপ না নেয়। শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত হোক কালাইনের প্রতিটি কোন, কিন্তু সেই আলো যেন বাণিজ্যিক মোহের প্রদীপে পুড়ে ছাই না হয়ে যায়, আজ এটাই বরাক উপত্যকার শেষ প্রান্তের সর্বজনীন দাবি ও সোচ্চার অঙ্গীকার।






