শিলচর পৌরনিগম নির্বাচনে ভোটের বাজারে ফের ফর্মের জাদু!

নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারি এবং আদর্শ আচরণবিধিকে সটান বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শিলচর পৌরনিগম এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে দেদার চলছে তথাকথিত ‘অরুণোদয়’ এবং ‘রেশন কার্ড’-এর নতুন মোড়কে গড়া লোভনীয় ফর্ম বিতরণের জমজমাট কারবার! সহজ-সরল, অভাবী ও দিন আনা দিন খাওয়া গরিব মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরাসরি প্রতারণার ফাঁদে ফেলার এই নগ্ন রূপ এখন শহরের অলিগলিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

নির্বাচনী আচরণবিধি জারির কড়া নির্দেশিকা থাকলেও শিলচর পৌরনিগম এলাকার অলিগলিতে তার ছিটেফোঁটাও বালাই নেই। অভিযোগ উঠেছে, বিগত বিধানসভা বা পঞ্চায়েত ভোটের প্রাক্কালে যে ফর্ম রাজনীতির হাতিয়ার হয়েছিল, পৌরনিগম নির্বাচনের প্রাক্কালেও ঠিক সেই একই কায়দায় গরিব মানুষকে টার্গেট করা হচ্ছে।  নির্বাচনী বিধিভঙ্গের এহেন দৃশ্য সাম্প্রতিক অতীতে শিলচরের রাজনীতিতে নতুন না হলেও পৌরনিগম নির্বাচনের প্রাক্কালে এর তীব্রতা সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে রাতারাতি গজিয়ে ওঠা কিছু সুযোগসন্ধানী নেতার দল সাধারণ মানুষকে সরকারি নানা প্রকল্পের মোলায়েম লোভ দেখাচ্ছে। বিশেষ করে শহরের বস্তি এলাকা এবং নিম্নবিত্ত অধ্যুষিত পাড়াগুলিতে রাতের অন্ধকারে বা গোপন দলীয় বৈঠকে ভোটারদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে নতুন ফর্ম।

অরুণোদয় প্রকল্পের বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেওয়া কিংবা খাদ্য সুরক্ষার নতুন রেশন কার্ডের কার্ড দেওয়ার নামে এই ফর্মগুলি পূরণ করানোর হিড়িক পড়ে গেছে। অথচ আদর্শ আচরণবিধি স্পষ্টতই নির্দেশ দেয় যে, ভোট ঘোষণার পর বা নির্বাচনের প্রাক্কালে এ ধরনের প্রলোভনমূলক ফর্ম বিতরণ বা সরকারি প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটার প্রভাবিত করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

কিন্তু কে শোনে কার কথা! আইনের তোয়াক্কা না করে একশ্রেণির মুখোশধারী নেতা বুক ফুলিয়ে এই বেআইনি কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। সহজ-সরল ও অভাবী মানুষগুলোর পেটের খিদে এবং সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এই সমস্ত মুখোশধারী ও সুযোগসন্ধানী নেতারা তাঁদের ভোট বাক্সে টানার ফন্দি এঁটেছেন। সাধারণ মানুষ সামান্য কিছু আর্থিক সাহায্য বা সরকারি সুবিধার আশায় এই নেতাদের পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছেন, আর সেই অসহায়তার সুযোগ নিয়ে দিনের পর দিন এক শ্রেণির রাজনৈতিক কারবারিরা অবাধে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন মহলের মতে, শিলচর পৌরনিগমের এই আসন্ন লড়াইয়ে নিজেদের রাজনৈতিক জমিন শক্ত করার মতো কোনো সদর্থক বা জনমুখী ভিশন বা উন্নয়নমূলক এজেন্ডা ওই নেতাদের ঝুলিতে নেই। পানীয় জল সমস্যা, নিকাশি ব্যবস্থার বেহাল দশা, যত্রতত্র জঞ্জালের স্তূপ কিংবা রাস্তার বেহাল অবস্থার মতো মৌলিক নাগরিক সমস্যাগুলির কোনো সুরাহা করতে না পেরে তাঁরা ফের শরণাপন্ন হয়েছেন সেই পুরনো ফ্রি-বিয়ে ও ভুয়া প্রতিশ্রুতির রাজনীতির।

ভোট এলেই তাঁদের মাথায় নতুন নতুন ফর্মের বুদ্ধি খোলে, আর ভোট ফুরোলেই সেই প্রতিশ্রুতির বেলুন চুপসে যায়। অতীতেও এই ধরনের ফর্ম ফিলাপ করে গরিব খেটে খাওয়া মানুষ বছরের পর বছর সরকারি দপ্তরে চক্কর কেটেছেন, হয়রানির শিকার হয়েছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উলটে ভোটের বাজারে রাজনৈতিক ফায়দা লুটে পকেট ভারী করেছে এই পাতি নেতারা। বারবার একই নাটকের পুনরাবৃত্তি দেখে এখন সাধারণ মানুষের মনে জমেছে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা।

নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এই ধরনের প্রকাশ্য বেআইনি কর্মকাণ্ড রমরমিয়ে চললেও রহস্যজনক কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগগুলি। শহরের বুদ্ধিজীবী সমাজ, প্রবীণ নাগরিক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের যৌথ মত, প্রশাসনের এই ধরনের নিষ্ক্রিয়তা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকেই সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

গরিব মানুষের পেটে লাথি মেরে, তাঁদের পেটের খিদে ও সরলতার সুযোগ নিয়ে এই ধরণের রাজনৈতিক প্রতারণা আর কতদিন চলতে দেওয়া হবে? এই প্রশ্ন এখন শিলচরের প্রতিটি চায়ের কাপে ও আড্ডায় তুফান তুলেছে। শহরবাসীর স্পষ্ট দাবি, নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে ঘুম ভাঙাতে হবে এবং এই ওয়ার্ডভিত্তিক অবৈধ ফর্ম বিতরণের চক্রটিকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিক সমাজ বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের টনক কবে নড়ে এবং এই প্রহসনের রাজনীতি কবে বন্ধ হয়!

Related Posts

ভোটে হেরে ইভিএম ও নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করাই কংগ্রেসের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে: শ্রীভূমি জেলা বিজেপি

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবি তুলে কংগ্রেস দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করছে: সঞ্জীব বণিক বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩০ সেপ্টেম্বরঃ নির্বাচনকে ঘিরে বিরোধী কংগ্রেস ও শাসকদল বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর ফের তীব্র হয়ে…

পুজোর দোরগোড়ায় মদে ভাসছে কাটিগড়া! আবগারি ও পুলিশের সুরক্ষায় রমরমিয়ে চলছে অবৈধ কারবার

গুমড়ায় ধৃত মদ ব্যবসায়ীদের বিস্ফোরক বয়ান, ওয়াইন শপে টাকা জমা দিয়েই চলত পুলিশের ম্যানেজ ফর্মুলা! বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩০ সেপ্টেম্বরঃ দোরগোড়ায় বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা। উৎসবকে ঘিরে যখন কাটিগড়া জুড়ে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *