ভুঁইফোড় বোর্ডের সার্টিফিকেট দিয়ে আর পার পাওয়া যাবে না, মেধা ও সততার অগ্নিপরীক্ষায় নামতে হচ্ছে প্রার্থীদের, শিলচর পুরনিগম নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিলের কড়া হুঁশিয়ারি
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র শিলচরের আকাশ-বাতাসে এখন একটাই জল্পনা, আসন্ন শিলচর পুরনিগম নির্বাচন। চায়ের কাপের ঝড় থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ের আড্ডা, রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে বাজারের থলি হাতে সাধারণ মানুষের ফিসফাস, সব জায়গাতেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে কেবল একটাই প্রশ্ন: কে হবেন আগামী দিনের শহরের প্রকৃত রূপকার?
অসম পুরনিগম আইন, ২০২২-এর কড়া অনুচ্ছেদের খাঁড়ায় কপালে ভাঁজ পড়ল একাধিক রাজনৈতিক নেতার; মনোনয়ন স্ক্রুটিনির আগেই চাঞ্চল্য।
তবে এই রাজনৈতিক উষ্ণতার মাঝেই এবার এমন এক আইনি ও নৈতিক বোম ফাটল, যা শাসক থেকে বিরোধী, সব শিবিরের মেরুদণ্ডেই কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। প্রার্থীর যোগ্যতা নির্ধারণে তথাকথিত ফাঁকফোকর গলিয়ে পার পাওয়ার দিন যে চিরতরে শেষ, তা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে নতুন প্রশাসনিক বিধি। জাল বা ভুয়া শংসাপত্র জমা দিলেই সোজা জেলের ভাত কিংবা প্রার্থিতা চিরতরে খারিজ, এই দ্ব্যর্থহীন হুঁশিয়ারিতে শিলচরের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এখন চলছে তীব্র শোরগোল ও চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ভুয়া ডিগ্রির দিন শেষ, জেল আর মামলার ভয়ে থরথর শিলচরের সম্ভাব্য প্রার্থীরা
যাঁরা এতদিন ধরে শিক্ষাগত যোগ্যতার কলামে মনগড়া ডিগ্রি বসিয়ে বা নামসর্বস্ব ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের ভুয়া সার্টিফিকেট ঝুলিয়ে সাধারণ ভোটারদের চোখে ধুলো দেওয়ার পুরনো খেলায় মেতেছিলেন, তাঁদের সেই বেপরোয়া দৌরাত্ম্যে এবার শক্ত আইনি শেকল পরানো হয়েছে। অসম পুরনিগম আইন, ২০২২-এর ধারা ৮(৬)(এম)-এর বিধান অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী যদি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে জেনেশুনে জাল, বিকৃত বা কৃত্রিম উপায়ে সংগৃহীত কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্র নির্বাচনী হলফনামায় দাখিল করার দুঃসাহস দেখান
শিক্ষাগত যোগ্যতার মোড়কে জালিয়াতির খেলা খতম
তবে তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার তো বটেই, ব্যক্তিগত জীবনেও নেমে আসবে ঘোর বিপদের কালোছায়া। কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হিসেবে তাঁর যোগ্যতা তো খারিজ হবেই, উপরন্তু নির্বাচন কমিশনের চোখে ধুলো দিয়ে তথ্য গোপনের অপরাধে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে সোজা স্থানীয় থানায় এফআইআর দায়ের কিংবা সরাসরি আদালতে ফৌজদারি মামলা রুজু করার কঠোরতম পথ বেছে নেওয়া হবে।
আইনের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনের এই বার্তা নেহাত কোনো মৌখিক হুশিয়ারি নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক কঠোর আইনি বাস্তবায়ন। বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, দেশের বা রাজ্যের কোনো অস্বীকৃত বোর্ড, ভুঁইফোড় কাউন্সিল বা ভিনরাজ্যের নামসর্বস্ব সন্দেহজনক প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো রকমে টাকা দিয়ে বা ম্যানেজ করে সংগৃহীত শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্রকে আর কোনোভাবেই বৈধ বলে গণ্য করা হবে না।
জাল সার্টিফিকেট জমা দিলেই শ্রীঘরে যাওয়ার রাস্তা পাকা!
সংবিধিবদ্ধ ও আইনি কোনো উদ্দেশ্যে যখনই এই ধরনের জাল নথি ব্যবহার করা হবে, তখনই স্ক্রুটিনির ছাঁকনিতে তা ধরা পড়ে যাবে এবং প্রার্থীর মনোনয়ন পত্র মুহূর্তের মধ্যে আইনানুগভাবে বাতিল ঘোষণা করা হবে। অর্থাৎ, হলফনামায় সই করার আগে এখন থেকে একশো বার ভাবতে বাধ্য হবেন প্রার্থীরা।
এই কঠোর আইনি কাঠামোর নেপথ্য ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার দূরদর্শী ও আপসহীন প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জমানাতেই ২০২২ সালের ১৪ মার্চ অসম বিধানসভায় এই যুগান্তকারী ‘অসম পুরনিগম বিল, ২০২২’ উত্থাপন করা হয়েছিল। তৎকালীন গৃহনির্মাণ ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অশোক সিংঘল অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বিলটি বিধানসভায় পেশ করেন, যা পরবর্তীকালে সর্বসম্মতভাবে আইনে পরিণত হয়। রাজ্যজুড়ে পুরনিগমগুলির পরিচালনা পর্ষদকে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ, পেশাদার এবং দক্ষ করে তোলার লক্ষে যে প্রশাসনিক রোডম্যাপ সেদিন তৈরি হয়েছিল, শিলচর পুরনিগম নির্বাচনের মুখে এসে তার আসল অগ্নিপরীক্ষা শুরু হয়েছে।
তথ্য গোপনের অপরাধে সোজা এফআইআর এবং ফৌজদারি মামলার হুমকি
এদিকে, এই কড়া আইনি বিধান প্রকাশ্যে আসতেই শিলচরের রাজনৈতিক দলগুলোর অন্দরমহলে চরম ত্রাস সৃষ্টি হয়েছে। শিলচরের সচেতন নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী মহল এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিন ধরে একটি গভীর ও গুরুতর অভিযোগ ছিল যে, অতীতে অনেক রাজনৈতিক দলই এমন সব প্রার্থীর হাতে টিকিটের ব্যাটন তুলে দিয়েছে, যাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা তো দূরের কথা, সাধারণ নাগরিক পরিষেবা পরিচালনা করার নূন্যতম মেধা বা প্রশাসনিক দূরদর্শিতাও ছিল না।
কেবল পেশিশক্তি, আর্থিক প্রতিপত্তি কিংবা দলের অন্দরের লবিংয়ের জোরে ছদ্মবেশধারী অনেক নেতাই ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ করে শহরের নিকাশি ব্যবস্থা, পানীয় জল কিংবা জঞ্জাল অপসারণের মতো মৌলিক সমস্যাগুলোকে বছরের পর বছর ধরে কেবল ধামাচাপা দিয়ে রেখেছেন। মেধার বদলে আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়ার এই দীর্ঘমেয়াদী খেসারত আজ চড়া সুদে গুনতে হচ্ছে শিলচরের আমজনতাকে।
শিলচর পুরনিগম নির্বাচনের মুখে শুদ্ধিকরণের দাবি তুলল সুধী সমাজ।
শিলচরের আপামর নাগরিক সমাজ আজ একবাক্যে দাবি তুলেছে, কেবল লোকদেখানো প্রচার বা হোর্ডিং সর্বস্ব রাজনীতি দিয়ে আর যাই হোক, একুশ শতকের আধুনিক শিলচর গড়া সম্ভব নয়। বরাক উপত্যকার এই প্রধান বাণিজ্যনগরী ও সংস্কৃতির সূতিকাগারের নাগরিকরা আজ যোগ্য ও সৎ জনপ্রতিনিধি পাওয়ার ন্যায্য অধিকার রাখেন।
জাল সার্টিফিকেট জমা দিলেই শ্রীঘরে যাওয়ার রাস্তা পাকা!
আসন্ন নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই উচিত সমস্ত রকম পক্ষপাতিত্ব ও পেছনের দরজার সমঝোতা ছুড়ে ফেলে কেবল নিখাদ শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেধা, সততা এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তির অধিকারীদের হাতেই টিকিট তুলে দেওয়া। যাঁদের নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তাঁরা কীভাবে একটি পুরো শহরের কয়েক লক্ষ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন, এই প্রশ্নটি আজ শিলচরের প্রতিটি সচেতন মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে।
শিলচর পুরনিগম নির্বাচনে আইনের নজিরবিহীন কড়াকড়ি
আইনের কড়াকড়ি এবং জনগণের তীব্র চাপের মুখে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে এখন বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি হয়েছে। দলগুলো কি সত্যিই দুর্নীতি ও ভুয়া সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি মেনে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করবে, নাকি বরাবরকার মতো এবারও অন্ধের মতো দাগী বা অযোগ্য মুখগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা করবে, তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে শিলচরের সর্বস্তরের জনগণ। আইনের ফাঁক ফোকর গলিয়ে পার পাওয়ার দিন শেষ। এখন দেখার বিষয়, শিলচরের রাজনৈতিক ময়দানে সততার এই অগ্নিপরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত কোন কোন মুখ সসম্মানে উত্তীর্ণ হন এবং কাদের রাজনৈতিক মুখোশ চিরতরে খুলে পড়ে।





