ডবল ইঞ্জিন সরকারের জিরো টলারেন্স কি ফাইলবন্দি? ১৫ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকার সংস্কার কোথায়? মরণফাঁদে পরিণত ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক, ক্ষোভে ফুঁসছে বরাক ও তিন রাজ্যের মানুষ

ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতি অনেকের কাছেই এখন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ একটি প্রতিশ্রুতি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বরাকবাসীর প্রশ্ন, যদি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়ে থাকে, তবে উন্নয়নের নামে বরাদ্দ বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরও কেন একের পর এক প্রকল্পের বাস্তব চিত্র এত হতাশাজনক হয়ে উঠছে? এই প্রশ্নই এখন ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে জনমনে।

তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে বরাক উপত্যকার লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক। সংস্কারের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের সরকারি দাবি থাকলেও বাস্তবে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অবস্থা আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রতিদিন মৃত্যুকে সঙ্গী করেই যাতায়াত করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ, রোগী, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী এবং তিন রাজ্যের হাজার হাজার ট্রাকচালককে। শনিবার কাটিগড়ার দিগরখাল এলাকার মা কালী হোটেলের পাশেই ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা যেন সেই বাস্তবতাকেই আরও নগ্নভাবে সামনে এনে দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সড়কের উপর একটি সেতুর অ্যাপ্রোচ অংশে তৈরি হওয়া বিশাল গর্ত এড়াতে গিয়ে রডবোঝাই একটি ভারী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায় ৫০ ফুট গভীর খাদে পড়ে যায়। ট্রাকটি মুহূর্তের মধ্যে দুমড়ে-মুচড়ে গেলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের তৎপরতায় চালককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং তার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি প্রশাসনিক অবহেলার ফল। আজ একজন চালক প্রাণে বেঁচে গেছেন, কিন্তু আগামীকাল হয়তো এতটা সৌভাগ্য কারও হবে না।

বর্তমানে মালিডহর থেকে বদরপুর ঘাট পর্যন্ত প্রায় পুরো সড়কজুড়েই অসংখ্য বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও রাস্তার উপর জমে থাকা জল ছোট নদীর রূপ নিয়েছে, আবার কোথাও পুকুরের মতো গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। দিনের বেলায় কোনোমতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও রাতের অন্ধকারে এই সড়ক কার্যত মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিপজ্জনক স্থানগুলিতে নেই পর্যাপ্ত সতর্কীকরণ বোর্ড, রিফ্লেক্টর, ব্যারিকেড কিংবা আলোকসজ্জার ব্যবস্থা। ফলে দূরপাল্লার গাড়িচালকরা হঠাৎ করেই বিপদের মুখে পড়ছেন।

সম্প্রতি তথ্যের অধিকার আইন (আরটিআই)-এর মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসা এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ নম্বর জাতীয় সড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রায় ১৫ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি নথিতে বিপুল অঙ্কের এই ব্যয়ের উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সড়কের বর্তমান অবস্থা সেই দাবিকে ঘিরে একাধিক গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয়দের বক্তব্য, যদি সত্যিই সংস্কারের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যয় করা হয়ে থাকে, তাহলে আজ কেন মালিডহর থেকে বদরপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে জাতীয় সড়ক ভাঙাচোরা, গর্তে ভরা এবং চলাচলের অযোগ্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে? কেন প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা? কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যাত্রীবাহী বাস, অ্যাম্বুলেন্স এবং পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের?

এই প্রশ্ন এখন আর শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং বরাক উপত্যকার সচেতন নাগরিক সমাজ, পরিবহন ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁদের মতে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের দাবি এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে যে বিস্তর ফারাক চোখে পড়ছে, তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ও কার্যকর ব্যবহার হলে আজ জাতীয় সড়কের বুকজুড়ে পুকুরসম গর্তের সৃষ্টি হতো না, প্রতিদিন ছোট-বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে পথ চলতে হতো না এবং চালকদের জীবনকে এভাবে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হতো না।

তাঁদের দাবি, সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের স্বার্থে পুরো সংস্কার প্রকল্পের একটি উচ্চপর্যায়ের, নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ তদন্ত অবিলম্বে শুরু করা উচিত। জনমনে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব কাগজে-কলমে থাকলেও তার বাস্তব প্রতিফলন কোথায়? আর সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক সংস্কার প্রকল্পকে ঘিরে ওঠা বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগ আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল।

এই সড়কের দুরবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জেলার অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সগুলিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই ভাঙাচোরা রাস্তা অতিক্রম করতে হচ্ছে। একজন অ্যাম্বুলেন্স চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অনেক সময় গুরুতর রোগী নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু রাস্তার গর্তের কারণে গতি বাড়ানো যায় না। রোগীর যন্ত্রণাও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা আরও সংকটজনক হয়ে পড়ে। একইভাবে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারাও প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বাস ও ছোট গাড়িতে দীর্ঘ সময় ধরে ঝাঁকুনি খেতে খেতে যাতায়াত করতে হচ্ছে তাদের। এক শিক্ষিকা বলেন, বর্ষার শুরুতেই এমন অবস্থা হয়। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। কখন কোন গাড়ি গর্তে পড়বে বা উল্টে যাবে সেই ভয় নিয়েই প্রতিদিন স্কুলে যেতে হয়।

৬ নম্বর জাতীয় সড়ক শুধু বরাক উপত্যকার জন্য নয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং মণিপুরের সঙ্গেও উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। প্রতিদিন শত শত পণ্যবাহী ট্রাক এই সড়ক দিয়ে খাদ্যসামগ্রী, নির্মাণ সামগ্রী, ওষুধ, পেট্রোলিয়াম পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় মালপত্র বহন করে। ট্রাকচালকদের অভিযোগ, এই সড়কের কারণে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। টায়ার, সাসপেনশন, অ্যাক্সেলসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ত্রিপুরাগামী এক ট্রাকচালক বলেন, আমরা রাস্তা দিয়ে চলছি নাকি যুদ্ধক্ষেত্র পার হচ্ছি বোঝা যায় না। প্রতি কয়েক কিলোমিটার পরপর গর্ত।

বৃষ্টির সময় কোনটা রাস্তা আর কোনটা গর্ত তা বোঝাই যায় না। মিজোরামগামী আরেক চালকের অভিযোগ, একটা দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু গাড়ির ক্ষতি নয়, মালপত্রও নষ্ট হয়। অনেক সময় কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়ে যায়। প্রতিদিন শতাধিক ছোট বড় বাহন এই সড়ক দিয়ে শিলচর-গুয়াহাটি রুটে চলাচল করে। যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, পুরো যাত্রাপথ এখন আতঙ্কে ভরা। গভীর গর্ত এড়াতে গিয়ে বাহনগুলোকে বারবার লেন পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। এক যাত্রী ক্ষোভ ব্যক্ত করে বলেন, বাসে উঠলে এখন মনে হয় নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব তো? রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে পুরো পথটাই আতঙ্কে কাটে।

প্রশ্ন উঠছে, আর কত দুর্ঘটনা, আর কত আহত, আর কত প্রাণহানি হলে প্রশাসনের টনক নড়বে? জাতীয় সড়ক অথচ তার অবস্থা গ্রামের কাঁচা রাস্তার চেয়েও খারাপ এমন মন্তব্য এখন সর্বত্র। স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত করে সংস্কার প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী ও মানসম্পন্ন সংস্কার কাজ শুরু করতে হবে।

বরাকবাসীর অভিযোগ, উন্নয়নের বড় বড় বিজ্ঞাপন, সরকারি সাফল্যের প্রচার এবং কোটি কোটি টাকার প্রকল্প ঘোষণার মধ্যেও বাস্তবের ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক আজ সরকারের উন্নয়ন দাবির উপর সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতদিন না এই সড়কের স্থায়ী সমাধান হচ্ছে, ততদিন প্রতিটি যাত্রাই যেন মৃত্যুর সঙ্গে এক নীরব লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের সাক্ষী হয়ে রয়েছে বরাক উপত্যকার মানুষ, ত্রিপুরা-মিজোরাম-মণিপুরের পরিবহন ব্যবস্থা এবং প্রতিদিন এই সড়কে চলাচল করা হাজার হাজার নিরীহ নাগরিক।

Related Posts

ভোট শেষ, সুবিধাও শেষ! নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি উধাও, বন্ধ ১০০ টাকার ডাল-চিনি-লবণ প্রকল্প

রেশন কার্ডধারীদের কপালে বাড়তি খরচের বোঝা, বাজেট সংকটের অজুহাতে অনিশ্চয়তায় লক্ষ লক্ষ পরিবার নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতির ঝড়, ভোটের পর বাস্তবতার কঠিন ধাক্কা। অসমের প্রায় ৭০ লক্ষ রেশন কার্ডধারী পরিবারকে স্বস্তি…

ওভারলোড কয়লা-চুনাপাথরের লরির সিন্ডিকেটে চক্রের তাণ্ডবে মরণফাঁদে পরিণত ছয় নং জাতীয় সড়ক

কার আশীর্বাদে চলছে ওভারলোড লরির সাম্রাজ্য? প্রতিদিন নাজেহাল শিক্ষার্থী, রোগী, কর্মজীবী ও সাধারণ মানুষ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২মেঃ বরাক উপত্যকার জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত কালাইন–মালিডহর–শিলচর ছয় নং জাতীয় সড়ক আজ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *