ভোট শেষ, সুবিধাও শেষ! নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি উধাও, বন্ধ ১০০ টাকার ডাল-চিনি-লবণ প্রকল্প

নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতির ঝড়, ভোটের পর বাস্তবতার কঠিন ধাক্কা। অসমের প্রায় ৭০ লক্ষ রেশন কার্ডধারী পরিবারকে স্বস্তি দেওয়া বহুল আলোচিত ১০০ টাকার ডাল-চিনি-লবণ প্রকল্পটি কার্যত থমকে দাঁড়িয়েছে। জুন মাস থেকে উপভোক্তারা আর রেশন দোকানের মাধ্যমে ১০০ টাকায় এক কেজি ডাল, এক কেজি চিনি এবং এক কেজি লবণ পাবেন না। সরকারের তরফে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ না হওয়ায় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

এই সিদ্ধান্ত বা পরিস্থিতি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ পণ্যের দাম লাগামছাড়া। ঠিক সেই সময়ে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির আশ্রয় হয়ে ওঠা প্রকল্পটির স্থগিত হওয়া নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে জনমনে।

২০২৫ সালের ১ অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার উদ্যোগে চালু হয়েছিল এই প্রকল্প। রাজ্যের জনবণ্টন ব্যবস্থার আওতায় থাকা পরিবারগুলিকে মাত্র ১০০ টাকায় ডাল, চিনি ও লবণ সরবরাহের ঘোষণা সরকারকে সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক ভাবমূর্তি এনে দিয়েছিল। সরকার দাবি করেছিল, এর ফলে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লক্ষ মানুষ উপকৃত হবেন। এরপর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে মুখ্যমন্ত্রী আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রতিশ্রুতি দেন, পুনরায় সরকার গঠন হলে এই তালিকায় চা পাতা ও ভোজ্য তেলও যুক্ত করা হবে।

ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে ভবিষ্যতে প্রকল্পটি আরও সম্প্রসারিত হবে। কিন্তু নির্বাচনের ফল ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। নতুন পণ্য যুক্ত হওয়া তো দূরের কথা, বিদ্যমান ডাল-চিনি-লবণের সুবিধাই বন্ধ হয়ে গেল। ফলে বিরোধীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলি কি শুধুই ভোটের কৌশল ছিল?

খাদ্য ও অসামরিক সরবরাহ বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ এখনও বিভাগ পায়নি। ফলে জুন মাসের জন্য কোনো সামগ্রী সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। সুলভ মূল্যের দোকানগুলিতেও এ সংক্রান্ত কোনো নির্দেশ পৌঁছায়নি। একজন রেশন ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের কাছে এখনও কোনো সরকারি নির্দেশ আসেনি। জুন মাসের জন্য ডাল, চিনি ও লবণের বরাদ্দও নেই। ফলে গ্রাহকদের দেওয়ার মতো কোনো মজুতও নেই। সরকারি সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে যে জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বাজেট অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ বাজেটে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ না হলে প্রকল্পটির পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

বর্তমানে বাজারে ডালের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। চিনির দামও ক্রমাগত বাড়ছে। লবণের ক্ষেত্রেও পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ১০০ টাকায় তিনটি পণ্য পাওয়ার সুযোগটি বহু দরিদ্র পরিবারের জন্য উল্লেখযোগ্য সহায়তা ছিল। গ্রামের দিনমজুর, ক্ষুদ্র কৃষক, চা-শ্রমিক, রিকশাচালক, গৃহপরিচারিকা কিংবা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের সংসারে এই প্রকল্পের সুবিধা বাস্তব অর্থেই সাশ্রয় এনে দিয়েছিল। মাসের শেষে হাতে কিছু অর্থ বেঁচে যেত।

এখন সেই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হবে। প্রকল্পটি বন্ধ হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসতেই অনেক উপভোক্তার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে মনে করেছিলেন, হয়তো বিনামূল্যের চালও বন্ধ হয়ে যাবে। তবে সরকার স্পষ্ট করেছে যে জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের আওতায় চাল সরবরাহ আগের মতোই অব্যাহত থাকবে। তবুও মানুষের উদ্বেগ কাটছে না। কারণ, একবার কোনো কল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ হলে তা পুনরায় চালু হবে কি না, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অনেকটাই কমে যায়।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত সাত মাসে এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ২৯০ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা করে খরচ হয়েছে রাজকোষ থেকে। প্রশ্ন উঠছে, এত বড় একটি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কেন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করা হলো না? যদি সরকার প্রকল্পটিকে দীর্ঘমেয়াদি করতে চাইত, তবে আগেভাগেই বাজেট সংস্থান নিশ্চিত করা যেত। আর যদি তা না করা হয়ে থাকে, তবে এটি কি শুধুই নির্বাচনী সময়ের জন্য তৈরি একটি অস্থায়ী রাজনৈতিক প্রকল্প ছিল? সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

তাই এ ধরনের প্রকল্প হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক প্রভাবও ফেলতে পারে। সরকার যদি আগামী বাজেটে প্রকল্পটি পুনরায় চালু করার পাশাপাশি চা পাতা ও ভোজ্য তেল অন্তর্ভুক্ত করে, তবে মানুষের ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। অন্যদিকে, যদি বাজেটেও এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ঘোষণা না আসে, তাহলে তা সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। বর্তমানে লক্ষ লক্ষ রেশন কার্ডধারী পরিবারের চোখ জুলাই মাসে পেশ হতে যাওয়া রাজ্য বাজেটের দিকে। তারা জানতে চাইছেন—সরকার কি আবারও ডাল, চিনি ও লবণের সুবিধা ফিরিয়ে আনবে?

নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চা পাতা ও ভোজ্য তেল কি সত্যিই যুক্ত হবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনো অজানা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপে জর্জরিত সাধারণ মানুষের কাছে এই প্রকল্প কেবল একটি সরকারি সুবিধা নয়, বরং নিত্যদিনের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা ছিল। সেই সহায়তা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা ক্রমশ বাড়ছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার আগামী বাজেটে মানুষের সেই প্রত্যাশার প্রতি কতটা সাড়া দেয়।

Related Posts

Is Cachar’s Sewa Setu Under the Grip of a Syndicate? General Citizens Allegedly Harassed by Middlemen at the Registration Office (PFC)

Allegations of Collusion Against PFC Staff as Victims Claim Transparency Has Been Replaced by Harassment Barak Bani Digital Desk,Silchar,19 July : The Assam Government introduced the Sewa Setu platform and…

Allegations of Money Collection in the Name of Hailakandi District Social Welfare Department Spark Concern

Complaint Filed at Katakhal Police Outpost Over Alleged Fraud of ₹90,500 from Several Anganwadi Workers Barak Bani Digital Desk, Hailakandi, July 8, 2026: A serious controversy has emerged surrounding the…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *