কার আশীর্বাদে চলছে ওভারলোড লরির সাম্রাজ্য? প্রতিদিন নাজেহাল শিক্ষার্থী, রোগী, কর্মজীবী ও সাধারণ মানুষ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ২মেঃ বরাক উপত্যকার জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত কালাইন–মালিডহর–শিলচর ছয় নং জাতীয় সড়ক আজ আর শুধু একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা নয়, বরং হাজারো মানুষের নিত্যদিনের দুর্ভোগ, উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়েছে। যে সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে, সেই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়কের বর্তমান বেহাল অবস্থা সাধারণ মানুষের জীবনে চরম ভোগান্তি ডেকে এনেছে।
সড়কের একাধিক অংশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য বড়-বড় গর্ত, কোথাও কোথাও রাস্তার পিচ সম্পূর্ণ উঠে গিয়ে কঙ্কালসার চেহারা ধারণ করেছে। বর্ষা এলেই কাদার সাগরে পরিণত হয় সড়কের বিস্তীর্ণ অংশ, আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলোর ঘন আস্তরণে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সামান্য বৃষ্টিতেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সড়কের বিভিন্ন অংশে সেতু ও কালভার্টের অবস্থা ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অতিরিক্ত চাপ এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় কোথাও কোথাও ধসের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে এই সড়ক ব্যবহারকারী মানুষের মনে প্রতিনিয়ত আতঙ্ক কাজ করছে। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসার জন্য রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, পরীক্ষার্থী শিক্ষার্থী কিংবা কর্মস্থলে ছুটে চলা মানুষের জন্য এই সড়ক আজ এক অবর্ণনীয় দুর্ভোগের নাম। বরাক উপত্যকার অর্থনীতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভরসা এই জাতীয় সড়কের এমন করুণ পরিণতি নিয়ে জনমনে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। স্থানীয়দের মতে, অবিলম্বে স্থায়ী ও কার্যকর সংস্কার এবং কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
কালাইন-মালিডহর-শিলচর সড়কে নিত্য দুর্ভোগে লক্ষাধিক মানুষ, সেতু ধস, ধুলোদূষণ ও যানজটে বিপর্যস্ত জনজীবন
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কালাইন–মালিডহর–শিলচর ছয় নং জাতীয় সড়কের বর্তমান বিপর্যস্ত অবস্থার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মেঘালয় এবং বিভিন্ন বহিঃরাজ্য থেকে আসা অতিরিক্ত বোঝাই পণ্যবাহী লরির অবাধ চলাচল। প্রতিদিন শত শত ট্রাক কয়লা, চুনাপাথর, পাথর, রড, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন ভারী পণ্য বহন করে এই সড়ক ব্যবহার করছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব যানবাহনের অনেকগুলোই নির্ধারিত ওজনসীমার তুলনায় বহু গুণ বেশি মালামাল বহন করছে, যার ফলে সড়কের ওপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং দ্রুত অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই ওভারলোড পরিবহনের ফলে জাতীয় সড়কের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, রাস্তার পিচ উঠে গেছে এবং একাধিক সেতু ও কালভার্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, সড়ক সংস্কারে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও অতিরিক্ত বোঝাই যানবাহনের লাগামহীন চলাচলের কারণে সেই সংস্কারের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, প্রশাসনের নজরের সামনেই এই অবস্থা চলতে থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি নিয়মিত তদারকি, ওজন পরীক্ষা এবং আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে কীভাবে এত সংখ্যক অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাক প্রতিদিন এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়ক ব্যবহার করছে?
এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে একাধিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। তাদের দাবি, শুধু সড়ক সংস্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং অতিরিক্ত বোঝাই পণ্যবাহী যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, নিয়মিত ওজন পরীক্ষা এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়ককে আরও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, যেখানে একটি ট্রাকের বৈধ বহনক্ষমতা সাধারণত ২০ থেকে ২৫ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা, সেখানে বহু ট্রাক ৫০-৫৫ এমনকি ৬০-৬৫ টনেরও বেশি পণ্য বহন করছে। এই অতিরিক্ত চাপের ফলে সড়কের উপরিভাগ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং একের পর এক সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি হরাং সেতুসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেতুর ক্ষতি ও ধসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের একাংশের মতে, পরিকল্পিত ধারণক্ষমতার বহু গুণ বেশি ওজনের যানবাহন নিয়মিত চলাচল করলে যেকোনো সড়ক ও সেতুর আয়ুষ্কাল দ্রুত কমে যায়।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে দিগরখাল টোলগেট এবং সংশ্লিষ্ট নজরদারি ব্যবস্থাকে ঘিরে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিদিন শত শত ভারী যানবাহন এই পথ দিয়ে চলাচল করলেও ওজন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। প্রতিবাদী নাগরিকদের বক্তব্য, যদি কঠোর নজরদারি সত্যিই কার্যকর থাকত, তাহলে এত বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাক কীভাবে বরাক উপত্যকায় প্রবেশ করছে? কেন বারবার সড়ক ভাঙছে? কেন দুর্ঘটনা কমছে না? এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর এখনও পায়নি সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ওভারলোড পণ্য পরিবহনের সঙ্গে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। অভিযোগ অনুযায়ী, এই চক্রের সঙ্গে পরিবহন ব্যবসা, পণ্য সরবরাহ, ট্রাক মালিক, মধ্যস্বত্বভোগী দালাল এবং কিছু প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর সম্পর্ক রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তিকে স্থানীয়ভাবে লাইফটাইম ব্যবসায়ী নামে অভিহিত করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রায়শই অকার্যকর হয়ে পড়ে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখনও প্রয়োজন, তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, মেঘালয় সীমান্ত থেকে বিপুল পরিমাণ কয়লা ও চুনাপাথর বরাক উপত্যকার বিভিন্ন সড়ক ব্যবহার করে বহন করা হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত খনিজ উত্তোলন এবং পরিবহন শুধু সড়কের ক্ষতিই করছে না, বরং পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে।
ধুলাবালি, বায়ুদূষণ, নদী ও জলাশয়ে দূষণ এবং কৃষিজমির ক্ষতির অভিযোগও উঠছে বিভিন্ন এলাকা থেকে। বিশেষ করে রাস্তার পাশে বসবাসকারী মানুষজন প্রতিদিন ধুলোর কারণে নানা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
সড়কের বর্তমান অবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা সময়মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারছে না। রোগীদের হাসপাতালে নিতে দেরি হচ্ছে। গর্ভবতী নারী, প্রবীণ নাগরিক এবং জরুরি রোগীদের জন্য এই পথ হয়ে উঠেছে এক দুঃস্বপ্ন। প্রতিদিন অফিসগামী মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকছেন। ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়ছেন। পরিবহন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে বাজারমূল্যের উপরেও।
স্থানীয় মহলে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে, বারবার সংস্কারের জন্য বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হওয়ার পরও কেন সড়কের স্থায়ী উন্নতি হচ্ছে না? কেন সংস্কারের অল্পদিনের মধ্যেই আবার গর্ত, ফাটল ও ভাঙনের সৃষ্টি হয়? জনসাধারণের দাবি, শুধুমাত্র সাময়িক মেরামত নয়, বরং ওভারলোড যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, আধুনিক ওজন পরিমাপ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ নজরদারি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
বরাক উপত্যকার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, নাগরিক মঞ্চ এবং সাধারণ মানুষ এখন একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি তুলছেন। তাদের প্রশ্ন, কারা এই অতিরিক্ত বোঝাই লরিগুলোকে সড়কে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে? কেন নিয়মিত নজরদারি সত্ত্বেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না? কার স্বার্থে সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?
মানুষের দাবি, ছয় নং জাতীয় সড়ককে বাঁচাতে হলে শুধু রাস্তা মেরামত করলেই হবে না, ওভারলোড পণ্যবাহী লরির দৌরাত্ম্য, অবৈধ পরিবহন চক্র এবং অভিযোগে উত্থাপিত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় বরাক উপত্যকার এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আরও ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে এবং তার মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।





