জমাজলমুক্ত শহর গড়ার  লক্ষ্যে শ্রীভূমির ব্রজেন্দ্র রোডে প্রশাসনের বৃহৎ উচ্ছেদ অভিযান

সকাল থেকেই গোটা এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অভিযানে উপস্থিত ছিলেন সদর সার্কল অফিসার বিকাশ ছেত্রী, শ্রীভূমি পুরসভার কার্যনির্বাহী আধিকারিক প্রীতম শইকিয়া, ডিএসপি মানসপ্রতীম বরা-সহ জেলা প্রশাসন, পুরসভা ও পুলিশের একাধিক আধিকারিক। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল শহরের প্রধান জলনিকাশী নালা ও ড্রেনের ওপর দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অবৈধ দখল সরিয়ে দেওয়া। প্রশাসনের দাবি, বহু বছর ধরে এই অবৈধ দখলের কারণে নালাগুলির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ছিল। জনস্বার্থে এই দখলদারিত্ব আর বরদাস্ত করা সম্ভব নয় বলেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এদিন চারটি জেসিবি মেশিন একযোগে অভিযান শুরু করে। নালা-নর্দমার ওপর নির্মিত একের পর এক অবৈধ ঘর, দোকান এবং অন্যান্য স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। বহু স্থানে বছরের পর বছর ধরে সরকারি জমি ও জলনিকাশী পথ দখল করে নির্মাণ করা হয়েছিল বলে প্রশাসনের দাবি। আসলে শহরের জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং নালা দখলকে চিহ্নিত করে আসছেন। সরকারি নালা ও ড্রেন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এগুলি জনস্বার্থে নির্মিত পরিকাঠামো। এগুলি দখল করে নির্মাণ করলে ক্ষতিগ্রস্ত হন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। কয়েকজনের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য একটি পুরো শহরকে বারবার জলমগ্ন হতে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ মে টানা কয়েক ঘণ্টার প্রবল বর্ষণে শ্রীভূমি শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ব্রজেন্দ্র রোড এলাকায় বহু বাড়িতে জল ঢুকে পড়ে। সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়। সেই সময় বাসিন্দারা দ্রুত স্থায়ী জলনিকাশী ব্যবস্থার দাবি তোলেন। এরপর প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নালা-নর্দমার ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

পরবর্তী সময়ে সদর সার্কল অফিসের কর্মীরা এলাকায় গিয়ে জমি পরিমাপ করেন এবং যেসব স্থাপনা সরকারি নালা বা জমির ওপর নির্মিত হয়েছে বলে চিহ্নিত হয়, সেখানে লাল দাগ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। এরপর গত ২৫ জুন পুরসভার কার্যনির্বাহী আধিকারিকের স্বাক্ষরিত নোটিশ ৬২ জন বাসিন্দার হাতে তুলে দেওয়া হয়। নোটিশে তিন দিনের মধ্যে স্বেচ্ছায় অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দখল না সরানোয় প্রশাসন মঙ্গলবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে।

তবে এই অভিযানের বিরোধিতাও করেছেন এলাকার একাংশের বাসিন্দা। তাঁদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানের আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্দিষ্ট এলাকাকে টার্গেট করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রকৃত সমস্যা নালা পরিষ্কার না করা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অপরিকল্পিত নগর পরিকল্পনা। সেই ব্যর্থতা আড়াল করতেই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে।

বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, প্রতিবছর নালা পরিষ্কারের নামে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ের দাবি করা হলেও বাস্তবে অধিকাংশ নালাই কচুরিপানা, আবর্জনা ও পলিতে ভরাট অবস্থায় পড়ে থাকে। ফলে বর্ষা এলেই জলনিকাশী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। তাঁদের প্রশ্ন, যদি সত্যিই আইন সবার জন্য সমান হয়, তাহলে শহরের অন্যান্য এলাকায় নালা-নর্দমার ওপর গড়ে ওঠা সব অবৈধ দখলের বিরুদ্ধেও কি একইভাবে অভিযান চালানো হবে?

উল্লেখযোগ্যভাবে, গত ১ জুন জেলা কমিশনারের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত নাগরিক সভায় মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল শহরের বিভিন্ন অবৈধ হাটবাজার ও স্ট্যান্ড উচ্ছেদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এরপর ঘাটলাইন ও পূর্ত বিভাগের কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় কিছু উচ্ছেদ অভিযান হলেও পরে আবার সেই বাজার পূর্বের অবস্থায় ফিরে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, উচ্ছেদ অভিযান যেন কেবল একদিনের প্রদর্শনী হয়ে না থেকে, সমগ্র শহরজুড়ে সমানভাবে আইন প্রয়োগের ধারাবাহিক উদ্যোগে পরিণত হয়।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর হওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতাও সমান জরুরি। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক প্রভাবশালীর জন্য যদি আলাদা নিয়ম থাকে, তবে সেই অভিযান জনসমর্থন হারাবে। কিন্তু যদি শহরের প্রতিটি সরকারি নালা, রাস্তা, ফুটপাত এবং সরকারি জমি সমানভাবে দখলমুক্ত করা হয়, তাহলে তার সুফল ভোগ করবেন সাধারণ মানুষই।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই অভিযান এখানেই শেষ নয়। বুধবারও উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং যেখানে যেখানে সরকারি নালা, ড্রেন বা জলনিকাশী পথ অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে, সেখানে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শহরবাসীর প্রত্যাশা, এই অভিযান যেন কেবল কয়েকটি ঘরবাড়ি ভাঙার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নালা সংস্কার, নিয়মিত পরিষ্কার, বৈজ্ঞানিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সমগ্র শহরকে অবৈধ দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হোক।

কারণ একটি শহরের উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকারি জমি, নালা বা জলনিকাশী পথ দখল করে ব্যক্তিগত নির্মাণ কোনোভাবেই সভ্য নগরজীবনের অংশ হতে পারে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনস্বার্থ রক্ষায় প্রশাসনের ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপই পারে ভবিষ্যতের জলাবদ্ধতামুক্ত, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য শ্রীভূমি গড়ে তুলতে।

Related Posts

Is Cachar’s Sewa Setu Under the Grip of a Syndicate? General Citizens Allegedly Harassed by Middlemen at the Registration Office (PFC)

Allegations of Collusion Against PFC Staff as Victims Claim Transparency Has Been Replaced by Harassment Barak Bani Digital Desk,Silchar,19 July : The Assam Government introduced the Sewa Setu platform and…

Allegations of Money Collection in the Name of Hailakandi District Social Welfare Department Spark Concern

Complaint Filed at Katakhal Police Outpost Over Alleged Fraud of ₹90,500 from Several Anganwadi Workers Barak Bani Digital Desk, Hailakandi, July 8, 2026: A serious controversy has emerged surrounding the…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *