একই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে দুটি প্রকল্প অনুমোদন ৪.৫৬ লক্ষ টাকার বরাদ্দ! শেরপুর গাঁও পঞ্চায়েতে দুর্নীতির অভিযোগে চাঞ্চল্য

সরকারি অর্থের অপব্যবহার, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং প্রকল্প অনুমোদনে প্রশ্ন তুলে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শেরপুর গাঁও পঞ্চায়েতের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ৯ নম্বর শেরপুর পার্ট–২ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র। স্থানীয়দের দাবি, একই ভবনের মেরামতের জন্য আলাদা দুটি প্রকল্প অনুমোদন করে সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা শুধু অস্বাভাবিকই নয়, বরং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত বহন করে।

অভিযোগকারী শায়েখ আহমেদের নেতৃত্বে স্থানীয় বাসিন্দারা ইতিমধ্যেই শ্রীভূমি জেলার জেলা আয়ুক্ত (ডিসি), জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিলামবাজার উন্নয়ন খণ্ডের খণ্ড উন্নয়ন আধিকারিক (বিডিও) এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা আসাম সরকারের মন্ত্রী তথা শ্রীভূমি জেলার অভিভাবক মন্ত্রী কৌশিক রাইয়ের হাতেও সমস্ত নথিপত্রসহ একটি বিস্তারিত অভিযোগপত্র তুলে দেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে ১৫তম অর্থ কমিশনের দ্বিতীয় কিস্তির আওতায় একই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের জন্য দুটি পৃথক প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে নিলামবাজার আঞ্চলিক পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ২ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা এবং শেরপুর গাঁও পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার ৩১৮ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অর্থাৎ একই এক-কক্ষবিশিষ্ট ভবনের মেরামতের জন্য মোট ৪ লক্ষ ৫৬ হাজার ৩১৮ টাকা সরকারি তহবিল থেকে বরাদ্দ হয়েছে বলে অভিযোগ।

এই বরাদ্দের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তাঁদের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা গ্ৰামীন এর আওতায় যেখানে প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার মধ্যে একটি নতুন পাকা বসতঘর নির্মাণ করা সম্ভব, সেখানে মাত্র একটি ছোট অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের মেরামতে সাড়ে চার লক্ষ টাকারও বেশি বরাদ্দ কীভাবে প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমোদন পেল? প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণে কী ধরনের মূল্যায়ন করা হয়েছে, সেই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু অর্থ বরাদ্দ নয়, প্রকল্প অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়াতেই একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে। সরকারি বিধি, কারিগরি মানদণ্ড এবং আর্থিক নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও গুরুতর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

অভিযোগে নিলামবাজার উন্নয়ন খণ্ডের সহকারী প্রকৌশলী জন্মজয় চক্রবর্তী, শেরপুর গাঁও পঞ্চায়েতের সচিব অশিম কুমার ভূঁইয়া এবং খণ্ড উন্নয়ন আধিকারিক অঞ্জিতা পালের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, একাধিকবার লিখিত অভিযোগ, সরকারি নথির অনুলিপি, ভিডিও প্রমাণ এবং অন্যান্য তথ্য জমা দেওয়া হলেও এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অভিযোগকারী শায়েখ আহমেদ বলেন, সরকারি অর্থ জনগণের করের টাকা। সেই অর্থ ব্যয়ে যদি স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে মানুষের আস্থা নষ্ট হবে।

আমরা চাই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সময়বদ্ধ তদন্ত হোক। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এদিকে বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শ্রীভূমি জেলার অভিভাবক মন্ত্রী কৌশিক রাই। তিনি বলেন, বিষয়টি আমি গুরুত্ব সহকারে দেখছি। শীঘ্রই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাঁর এই আশ্বাসে স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা আশা তৈরি হলেও, দ্রুত তদন্ত শুরু না হওয়া পর্যন্ত ক্ষোভ প্রশমিত হচ্ছে না।

ঘটনার আরেকটি দিক নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার সময় ঘটনাস্থলে কেবল আঞ্চলিক পঞ্চায়েতের প্রকল্পের একটি সাইনবোর্ড ছিল। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের পরদিন রাতারাতি গাঁও পঞ্চায়েতের প্রকল্পের আরও একটি সাইনবোর্ড সেখানে বসানো হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে, সাইনবোর্ডটি আগে কেন ছিল না? সংবাদ প্রকাশের পর হঠাৎ সেটি লাগানোর প্রয়োজন কেন দেখা দিল? স্থানীয়দের মতে, এই ঘটনাও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা উচিত।

অভিযোগপত্রের অনুলিপি রাজ্যের মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল, পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ উন্নয়ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন আধিকারিক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরেও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং বিভিন্ন নথিপত্র এখন প্রশাসনের হাতে রয়েছে, তবুও এখনও পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করা। কিন্তু সেই প্রকল্পকে ঘিরেই যদি অর্থ অপচয়, দ্বৈত বরাদ্দ বা প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তবে তা শুধু একটি পঞ্চায়েতের ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে না; বরং গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করায়। এখন নজর প্রশাসনের দিকে। অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত সত্য সামনে আনা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। 

Related Posts

Is Cachar’s Sewa Setu Under the Grip of a Syndicate? General Citizens Allegedly Harassed by Middlemen at the Registration Office (PFC)

Allegations of Collusion Against PFC Staff as Victims Claim Transparency Has Been Replaced by Harassment Barak Bani Digital Desk,Silchar,19 July : The Assam Government introduced the Sewa Setu platform and…

Allegations of Money Collection in the Name of Hailakandi District Social Welfare Department Spark Concern

Complaint Filed at Katakhal Police Outpost Over Alleged Fraud of ₹90,500 from Several Anganwadi Workers Barak Bani Digital Desk, Hailakandi, July 8, 2026: A serious controversy has emerged surrounding the…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *