বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ আগষ্টঃ যে বরাক নদী উপত্যকার হাজারও জীবনের স্পন্দন, সেই বরাকের জলরাশিই সাক্ষী থাকল এক চরম ও মর্মান্তিক পরিণতির। অবুঝ ও নিষ্পাপ সন্তানকে কোমরে শক্ত করে বেঁধে প্রমত্তা নদীর বুকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন এক অসহায় মা। ঘটনার চারদিন পর, মঙ্গলবার অবশেষে গনিরগ্রাম বাজার সংলগ্ন বরাক নদী থেকে মা ও শিশুর ভেসে ওঠা নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ চারদিনের উৎকণ্ঠা ও তল্লাশি অভিযানের এমন হৃদয়বিদারক অন্তিমে গোটা শিলচর শহরসহ সমগ্র এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত শুক্রবার। দুধপাতিল বাগান এলাকার এক গৃহবধূ তাঁর কোলের অবুঝ শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাননি কী ভয়াবহ সিদ্ধান্ত লুকিয়ে ছিল তাঁর অন্তরে। শিলচরের ঐতিহাসিক অন্নপূর্ণা ঘাটে পৌঁছে, কোন এক গভীর মানসিক যন্ত্রণা বা পারিবারিক সংকটের তাড়নায়, তিনি নিজের কচি শিশুটিকে সযত্নে ও শক্ত করে নিজের কোমরে বাঁধেন। এরপরই উপস্থিত পথচারীদের স্তব্ধ করে দিয়ে বরাক নদীর উত্তাল স্রোতে ঝাঁপ দেন।
ঘটনার পর মুহূর্তেই নদীর পাড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে দ্রুত অন্নপূর্ণা ঘাটে পৌঁছায় পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এসডিআরএফ)। তৎক্ষণাৎ নদীতে শুরু হয় জোরদার উদ্ধার অভিযান। তবে বর্ষার বরাকের তীব্র স্রোত ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে প্রথম কয়েকদিন নিখোঁজ মা ও শিশুর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফলে প্রহর গুণছিলেন স্বজনরা।
মঙ্গলবার সকালে ঘটনার নাটকীয় ও বিষাদময় মোড় ঘোরে। অন্নপূর্ণা ঘাট থেকে অনেকটা দূরে, গনিরগ্রাম বাজার সংলগ্ন বরাক নদীতে স্থানীয় কয়েকজন জলজটলা ও ভাসমান বস্তু দেখতে পান। কাছে গিয়ে ভালো করে প্রত্যক্ষ করতেই চমকে ওঠেন তাঁরা। নদীর জলে ভাসছিল এক মহিলার দেহ। কালবিলম্ব না করে খবর দেওয়া হয় স্থানীয় ফাঁড়ি ও থানায়।
পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নদী থেকে দেহটি ডাঙ্গায় তোলে। তখনই উন্মোচিত হয় সেই বুকভাঙা দৃশ্য—মৃত্যুর পর পরপার পাড়ি দিলেও মায়ের কোমর থেকে আলগা হয়নি সন্তানকে বেঁধে রাখা সেই বন্ধন। মরণপণ যাত্রাতেও সন্তানকে নিজের শরীর থেকে আলাদা হতে দেননি ওই মা। কোমরে শক্ত করে বাঁধা অবস্থায় মায়ের সঙ্গেই উদ্ধার হয় শিশুটির নিথর দেহ।
পুলিশ উভয় মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রেরণের ব্যবস্থা করে। খবরটি চাউর হতেই গনিরগ্রাম বাজার ও অন্নপূর্ণা ঘাট এলাকায় শত শত উৎসুক ও ব্যথিত মানুষের ভিড় জমে যায়। উদ্ধার হওয়া দৃশ্য দেখে উপস্থিত অনেককেই চোখের জল ধরে রাখতে দেখা যায়নি।
একজন গৃহবধূ কীভাবে এমন চরম ও মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। এটা কি শুধুই কোনো পারিবারিক কলহের পরিণতি, না কি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে অন্য কোনো মানসিক বা সামাজিক অত্যাচার? তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ ইতিমধ্যে একটি অপমৃত্যুর মামলা রুজু করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে ঘটনার মূল কারণ উদঘাটনের চেষ্টা চালাচ্ছেন তদন্তকারী আধিকারিকেরা।






