কাটিগড়ার বুরুঙ্গার মাটিতে কারখানা, স্থানীয়দের অধিকার ঝুলিয়ে রেখে বহিরাগতদের প্রাধান্য, জ্বলছে ক্ষোভের আগুন
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ হিন্দুস্তান পেপার করপোরেশনের পঞ্চগ্রাম পেপার মিল এবং আনিপুর সুগার মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বরাক উপত্যকার অর্থনীতিতে এক শ্মশানের নীরবতা নেমে এসেছিল। হাজার হাজার শ্রমিক পরিবারের চোখে নামা অন্ধকারের মাঝে কাটিগড়ার বুরুঙ্গায় ‘স্টার সিমেন্ট’ কারখানা স্থাপনের ঘোষণা এক চিলতে আলোর দিশারি হয়ে এসেছিল। এলাকার সাধারণ মানুষ, বেকার যুবসমাজ এবং দৈনিক মজুররা ভেবেছিলেন, এবার হয়তো দিন বদলাবে। উপত্যকার মাটিতে আবার নতুন করে শিল্পায়নের চাকা ঘুরবে, ঘরের ছেলেমেয়েরা ঘরের পাশে কাজ পাবে।
কিন্তু কারখানা শুভ উদ্বোধনের এক বছর অতিক্রান্ত হলেও সেই স্বপ্নের বেলুন আজ নিমেষেই ফুটো হয়ে গেছে। আশার আলো নিভে গিয়ে বুরুঙ্গার বাতাসে এখন কেবল হতাশা, ক্ষোভ আর প্রতারণার গন্ধ। স্থানীয় সচেতন মহলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে মাটিতে কারখানা গড়ে উঠল, যে মাটির সুবাদে কারখানার চাকা ঘুরছে, সেই কাটিগড়া তথা কাছাড়ের কতজন স্থানীয় যুবক-যুবতী সেখানে স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কাজ পেলেন? আর কতজন বহিরাগতকে এনে সেই পদে বসানো হলো? কেন এই হিসেব প্রকাশ করতে কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় নেতাদের এত ভয়?
কাটিগড়ার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কারখানা তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু হওয়ার সময় এলাকার পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন। কারখানা নির্মাণের ঘোষণা হতেই কাটিগড়ায় রাতারাতি গজিয়ে উঠেছিল বেশ কয়েকটি নতুন সংগঠন। বিভিন্ন ব্যানারে ছেয়ে গিয়েছিল রাস্তাঘাট।
স্থানীয়দের চাকরিতে প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে, এই এক দফা দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন তথাকথিত ছাত্র ও যুব নেতারা। কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চলেছিল দফায় দফায় টানটান বৈঠক ও স্মারকলিপি প্রদান। অবশেষে সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নিজে এসে কারখানাটির শুভ উদ্বোধন করেন।
কিন্তু নাটকের আসল অংক শুরু হয় উদ্বোধনের পরেই! মুখ্যমন্ত্রী ফিতে কেটে ফিরে যাওয়ার পর থেকেই রাজপথের সেই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর যেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ যেন মাস্টার সুইচ বন্ধ করে আন্দোলনকারীদের মুখ বন্ধ করে দিল। এলাকাবাসীর বিস্ফোরক প্রশ্ন, উদ্বোধনের পর হঠাৎ করে সেই সিংহহৃদয় নেতাদের প্রতিবাদ থেমে যাওয়ার গোপন রহস্যটা কী?
রাজপথে মাইক হাতে গর্জে ওঠা সেই নেতারা আজ কোন অদৃশ্য গুহায় লুকিয়ে আছেন? তবে কি টেবিলের তলা দিয়ে কোনো ‘রহস্যময় চুক্তি’ বা মোটা অংকের আর্থিক সমঝোতা হয়ে গেছে? স্থানীয়দের আবেগ বিক্রি করে কি নিজেদের পকেট ভারী করলেন নেতৃত্ববৃন্দ?
আজ কারখানা চত্বরে গেলে এক করুণ চিত্র চোখে পড়ে। প্রতিদিন সকাল হলেই কারখানার গেটের বাইরে শত শত স্থানীয় বেকার যুবক ও স্থানীয় দৈনিক মজুররা ভিড় করেন এক চিলতে কাজের আশায়। কিন্তু দিনশেষে তাঁদের খালি হাতেই ফিরে আসতে হয়। অন্যদিকে, সচেতন মহলের অভিযোগ, কারখানার উচ্চপদস্থ আধিকারিক থেকে শুরু করে সাধারণ টেকনিশিয়ান এবং এমনকি অদক্ষ শ্রমিকের কাজগুলোতেও চুপিচুপি নিয়োগ করা হচ্ছে বরাক উপত্যকার বাইরের লোকজনকে।
বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো সরকারি বা বেসরকারি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি। স্থায়ী পদ তো বটেই, এমনকি ঠিকা শ্রমিক নিয়োগেও বাইরের রাজ্য ও জেলার মানুষদের প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ। এলাকার বিধায়ক বা স্থানীয় প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতারা এ বিষয়ে টু শব্দটি করছেন না। স্থানীয় ভূমিপুত্র শ্রমিকদের বদলে কম মজুরিতে বহিরাগত ঠিকা শ্রমিক সরবরাহ করার ছক। |
কাটিগড়ার বুরুঙ্গার মানুষ নিজেদের জমি দিয়েছেন, পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি মাথার ওপর তুলে নিয়েছেন এই বিশ্বাসে যে—এলাকার অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, বেকারত্বের অভিশাপ দূর হবে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি দেখে ক্ষুব্ধ সচেতন জনগণ প্রশ্ন তুলছেন, বুরুঙ্গায় এত বড় সিমেন্ট কারখানা তৈরি করে শেষ পর্যন্ত লাভ হলো কার? যদি বুরুঙ্গা ও কাটিগড়াবাসীর ভাগ্যে জোটে কেবল কারখানার উড়ান্ত ধোঁয়া, ধুলো আর পরিবেশের ক্ষতি, আর চাকরির সমস্ত সুফল চলে যায় বহিরাগতদের পকেটে, তবে এমন শিল্পায়নের প্রকৃত মূল্য কী?
কারখানা কর্তৃপক্ষ, নিরুদ্দেশ হওয়া ভুঁইফোঁড় সংগঠন এবং নীরব জনপ্রতিনিধিদের কাছে কাটিগড়ার সাধারণ মানুষ এখন স্পষ্ট ও লিখিত পরিসংখ্যান চান, আজ পর্যন্ত এই কারখানায় কতজন ভূমিপুত্রকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং কতজন বহিরাগতকে স্থান দেওয়া হয়েছে? এই হিসাব যদি অবিলম্বে জনসমক্ষে না আনা হয়, তবে বুরুঙ্গার এই বিষাক্ত নীরবতা খুব শীঘ্রই আরও এক রক্তক্ষয়ী গণ-আন্দোলনের বারুদে আগুন জ্বালাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।






