বড়খলার চেছরীতে গভীর রাতে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ১০ লক্ষ টাকা দাবি, ফেলে যাওয়া তাজা গুলিতে থমথমে এলাকা, প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ ভুক্তভোগীর

রাতের অন্ধকারে বেডরুমে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি, নারকীয় প্রহার, মোবাইল ছিনতাই এবং খোদ পুলিশের নাকের ডগায় তাণ্ডব চালিয়ে অপরাধীদের নির্বিঘ্নে চম্পট দেওয়ার এই ঘটনা বরাক উপত্যকার শান্ত জনপদে এক অন্ধকার ও ভীতিপ্রদ অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

ঘটনার বিবরণ শুনলে যেকোনো মানুষের রক্ত হিম হয়ে আসবে। গত শনিবার গভীর রাতে যখন গোটা চেছরী গ্রাম গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, প্রকৃতির পটে নামছে নিঝুম নীরবতা, ঠিক সেই মুহূর্তেই স্থানীয় বাসিন্দা জাবেদ হোসেন বড়লস্করের বসতবাড়ির দরজা ভেঙে অতর্কিতে হানা দেয় দুই সশস্ত্র দুষ্কৃতী। অভিযোগ, ঘরের ভেতরে জোরপূর্বক প্রবেশ করেই তারা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন জাবেদ হোসেনকে সজোরে জাগিয়ে তোলে। কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁর বুক ও কপালে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে শুরু হয় পৈশাচিক মানসিক ও শারীরিক নিগ্রহ।

দুষ্কৃতীদের সাফ দাবি ছিল, আগামী কিছুক্ষণের মধ্যে দশ লক্ষ টাকা নগদ চাঁদা দিতে হবে, নতুবা জাবেদ হোসেনসহ তাঁর গোটা পরিবারকে চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। আকস্মিক এই হামলায় পরিবারে কান্নার রোল পড়ে যায়। দাবিমত অত টাকা দিতে অস্বীকার করায় জাবেদের ওপর অকথ্য শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে ভাগ্যের ফেরে জাবেদের এক ভাগিনা আকস্মিক সেখানে এসে পৌঁছালে দুষ্কৃতীরা তাঁর ওপর আরও হিংস্রভাবে চড়াও হয় এবং বেধড়ক মারধর করে।

যাওয়ার সময় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে জাবেদের দুটি দামি মোবাইল ফোন ছিনতাই করে তারা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও স্পর্ধার বিষয় হলো, ঠিক দশ দিন পরে আবার এসে বকেয়া টাকা তুলে নিয়ে যাবে, এই বলে কুখ্যাত দুষ্কৃতীরা হুমকি দিয়ে যায় এবং যাওয়ার সময় ঘটনাস্থলে একটি তাজা গুলি ফেলে রেখে পালায়।

রবিবার সকালে এই ভয়াবহ ঘটনার পর হতভম্ব জাবেদ হোসেন বড়লস্কর বড়খলা থানায় গিয়ে পুরো বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানান। খবর পাওয়া মাত্রই বড়খলা থানার পুলিশ ফোর্স ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং অপরাধীদের ফেলে যাওয়া সেই তাজা গুলিটি উদ্ধার করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি গুলি উদ্ধার বা পুলিশের প্রাথমিক পরিদর্শন কি এই ত্রাসগ্রস্ত পরিবারটির মনে আস্থা ফেরাতে পেরেছে?

উত্তর হলো না। এই ঘটনার পর থেকেই গোটা চেছরী এলাকায় এক গভীর ও থমথমে আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে। এলাকার মানুষ এখন সূর্য ডুবলেই ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী সবার মনেই একটিমাত্র প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, এভাবে যদি রাতের আঁধারে বাড়িতে ঢুকে অস্ত্র দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা দাবি করা হয়, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

মঙ্গলবার সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলে নিজের অসহায়ত্ব ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত জাবেদ হোসেন বড়লস্কর। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের তীব্র সমালোচনা করে তিনি অবিলম্বে কুখ্যাত ওই দুষ্কৃতীদের গ্রেফতারে জোরালো দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, নিজের ও পরিবারের জানমালের সুরক্ষার স্বার্থে চেছরী এলাকায় নিয়মিত ও কড়া পুলিশি টহলদারির দাবি তুলেছেন তিনি।

বড়খলার মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে অপরাধীচক্রের এমন আস্ফালন প্রমাণ করে যে, দুষ্কৃতীদের মনে আইনের কোনো ভয়ই আর অবশিষ্ট নেই। পুলিশি নজরদারির ফাঁক গলে এই ধরনের অপরাধীরা যদি অবাধে ঘুরে বেড়ায় এবং প্রকাশ্যে চাঁদা দাবি করে, তবে আগামিদিনে বৃহত্তর সমাজ এক চরম বিপদের মুখে পতিত হবে। অবিলম্বে এই ঘটনার গভীরে গিয়ে মূল অভিযুক্তদের পাকড়াও করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করলে, চেছরীর সাধারণ মানুষ বৃহত্তর আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে বলেই মনে করছে সচেতন মহল।

  • Related Posts

    পুজোর আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হল মৃত্যুমিছিলে! চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৭ জনের মৃত্যুর খবর

    বৃষ্টির মধ্যে মণ্ডপে উপচে পড়া ভিড়, পিছন থেকে ধাক্কা, তার পরই হুড়োহুড়ি! বহু আহতের অবস্থা সংকটজনক, মৃতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ পুজোর আনন্দ, আলোর ঝলকানি আর…

    ২০২৩ সালেই কি শুরু হয়েছিল ‘নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণের’ আসল খেলা?

    বিরোধীদের ঘুম ভাঙতে দেরি, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন ঘিরে প্রশ্নের মুখে গণতন্ত্রের নিরপেক্ষতা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ ভারতের গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং অবাধ ও…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *