বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ যে ব্যাংকে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁদের রক্তঘাম করা উপার্জিত অর্থ সুরক্ষিত মনে করে জমা রাখেন, সেই ব্যাংকই যদি পরিণত হয় জাল নোটের গুদামে? উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরের সোফিয়া মার্কেট শাখায় পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক এর কারেন্সি চেস্টে যে ভয়াবহ জালিয়াতির উন্মোচন ঘটেছে, তা ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থার চরম গাফিলতি ও সুরক্ষার ফাঁপা বেলুনকে এক লহমায় ফুটো করে দিয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে যেখানে ৭ কোটি টাকার জাল নোটের হদিস পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন তদন্তকারীরা, অডিট ও তদন্ত এগোতেই সেই পরিমাণ এক লাফ দিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি টাকায়! ব্যাংকের ভেতরে এই বিপুল পরিমাণ জাল নোটের সাম্রাজ্য গড়ে ওঠা এবং প্রকাশ্যে আসা ঘটনা প্রমাণ করে দিচ্ছে, এই জালিয়াতি কেবল এক সাফাইকর্মীর চুরি নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে প্রশাসনিক মদত ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের গভীর যোগসাজশ। ঘটনার সূত্রপাত কয়েক দিন আগে, যখন সাহারানপুরের সোফিয়া মার্কেট শাখার কারেন্সি চেস্টে ছেঁড়া-ফাটা ও পুরোনো নোটের গুচ্ছ সাজানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিশাল কুমার নামে এক পার্ট-টাইম হাউসকিপার বা সাফাইকর্মীকে।
৫ আগস্ট, ২০২৬ রিজার্ভ ব্যাংকে টাকা প্রেরণ, সাহারানপুর কারেন্সি চেস্ট থেকে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকার নোট ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক এর জয়পুর শাখায় পাঠানো হয়। সেখানে নোট গোনার সময় দেখা যায় ৪ লাখ ৩০ হাজার ৯০০ টাকা কম রয়েছে। মেরঠ জোনাল হেড অজয় কুমার টিবরেওয়ালের নির্দেশে প্রধান ব্যবস্থাপক অরুণ কুমার চৌবেকে সাহারানপুরে তদন্তে পাঠানো হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সাফাইকর্মী বিশাল কুমার কৌশলে নোটের বান্ডিল থেকে টাকা সরাচ্ছে। ৯ আগস্ট, ২০২৬ জাল নোটের পাহাড় উদ্ধার, অডিট চলাকালীন দেখা যায় কারেন্সি চেস্টে শুধু টাকা কমই নয়, ভেতরে মজুত রয়েছে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকার জাল নোট!
তদন্তকারী অরুণ কুমার চৌবের প্রশ্নের সদুত্তর দিতে না পারায় সিনিয়র ডিভিশনাল ম্যানেজার রবি কুমার কাঁসে, কারেন্সি চেস্ট ম্যানেজার সুশীল কুমার এবং বর্তমানে হরিয়ানায় কর্মরত প্রাক্তন চেস্ট ম্যানেজার অমিত কুমারকে সাসপেন্ড করা হয়। সদর বাজার থানায় মামলা দায়ের হয়। সোমবার রাত ৯টায় থানার অভিযোগে অর্থমূল্য সংশোধন করে জানানো হয়, মোট ১৭ কোটি টাকার জাল নোট উদ্ধার হয়েছে এবং এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে।
তদন্তকারী দলের সদস্যরা ব্যাংকের বান্ডিল পরীক্ষা করতে গিয়ে রীতিমতো চোখ কপালে তুলেছেন। জাল নোটগুলি অত্যন্ত সুচতুরভাবে আসল নোটের ভিড়ে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একটি বান্ডিলের একদম ওপরে রাখা হতো একটি আসল নোট এবং একদম নিচে রাখা হতো আরেকটি আসল নোট। আর মাঝে পুরে দেওয়া হতো শত শত জাল নোট! ফলে ওপর থেকে দেখলে বোঝার উপায় ছিল না যে পুরো বান্ডিলটি আসলে জাল নোটে ঠাসা।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মতে, এত বড় স্তরের জাল নোটের কারবার কোনো একজন পার্ট-টাইম কর্মচারীর পক্ষে একা পরিচালনা করা অসম্ভব। কর্মকর্তাদের সায় ও নিয়মিত নজরদারির অভাব ছাড়া কীভাবে দিনের পর দিন কোটি কোটি টাকার আসল নোট বাইরে চলে গেল এবং তার বদলে কারেন্সি চেস্টে প্রবেশ করল ১৭ কোটি টাকার ভুয়ো নোট, তা নিয়ে সদুত্তর দিতে ব্যর্থ ব্যাংকের শীর্ষ মহল।
পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক এর কারেন্সি চেস্টে জাল নোট সংক্রান্ত ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে ব্যাংকের সিনিয়র ডিভিশনাল ম্যানেজার, কারেন্সি চেস্টের ম্যানেজার, প্রাক্তন চেস্ট ম্যানেজার এবং এক পার্ট-টাইম হাউসকিপার রয়েছেন। ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের তাৎক্ষণিকভাবে সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআরও দায়ের করা হয়েছে। অন্যদিকে, পার্ট-টাইম হাউসকিপারকে কাজ থেকে বরখাস্ত করার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে চুরির মামলা করা হয়েছে।
রবি কুমার কাঁসে| সিনিয়র ডিভিশনাল ম্যানেজার, পিএনবি| তাৎক্ষণিক সাসপেন্ড ও এফআইআর, সুশীল কুমার, কারেন্সি চেস্ট ম্যানেজার, সাহারানপুর| তাৎক্ষণিক সাসপেন্ড ও এফআইআর, অমিত কুমার, প্রাক্তন চেস্ট ম্যানেজার; বর্তমানে যমুনানগর-জগাধরি, হরিয়ানা| তাৎক্ষণিক সাসপেন্ড ও এফআইআর বিশাল কুমার| পার্ট-টাইম হাউসকিপার (সাফাইকর্মী)|
কাজ থেকে বরখাস্ত ও চুরির মামলা সদর বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নেমচাঁদ জানিয়েছেন, এই ঘটনায় আগে যে মামলা দায়ের করা হয়েছিল, সেই মামলাতেই জাল নোটের বর্ধিত অর্থমূল্য যুক্ত করা হয়েছে। নতুন তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটির গভীর তদন্ত চালানো হচ্ছে। পুলিশের তদন্তে কারেন্সি চেস্টে জাল নোটের প্রবেশ, সংরক্ষণ ও লেনদেনের সঙ্গে কারা কীভাবে যুক্ত ছিলেন, সেই বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সাধারণ মানুষ যখন ব্যাংকে কোনো টাকা জমা দিতে যান, তখন একটি ৫০ টাকার নোট একটু ছেঁড়া বা সন্দেহজনক হলে ব্যাংক ক্যাশিয়ার তা বাতিল করে দেন বা জমা নিতে চান না। অথচ, সেই ব্যাংকেরই কারেন্সি চেস্টে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকার জাল নোটের জাল বোনা হচ্ছে! পিএনবি-এর মণ্ডল কার্যালয়ের সিনিয়র ম্যানেজার নিশা সিং স্বীকার করেছেন যে অডিট এখনও শেষ হয়নি এবং আরও জাল নোট উদ্ধার হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
তবে কেবল চারজনকে বলির পাঁঠা বানিয়ে কি পিএনবি তার দায় এড়াতে পারে? রিজার্ভ ব্যাংকের কঠোর নিয়ম থাকা সত্ত্বেও কীভাবে মাসের পর মাস কারেন্সি চেস্টের অডিটে এই বিশাল গরমিল ধরা পড়ল না?একজন চুক্তিভিত্তিক সাফাইকর্মী সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও অবাধে বান্ডিল থেকে টাকা সরিয়ে নিচ্ছে, এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপকেই উন্মোচিত করে।
সাহারানপুরের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে কেবল বাইরের সাইবার অপরাধী বা প্রতারক নয়, ভারতের ব্যাংক ব্যবস্থার ভেতরেই বসে রয়েছে আসল ঘুণপোকা। এই ১৭ কোটি টাকার জাল নোটের নেপথ্যে কোনো আন্তর্জাতিক জাল নোট পাচারকারী চক্র বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক হাত রয়েছে কি না, তা এখন পুলিশি তদন্তের পরেই পরিষ্কার হবে। কিন্তু ততক্ষণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ওপর সাধারণ জনমানুষের বিশ্বাসের ভিত যে আরও একবার বড়সড় ঝাঁকুনি খেল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।






