কেন্দ্রের তথ্য সুরক্ষা আইনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ ২১টি শীর্ষ সংবাদমাধ্যম
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৭ অক্টোবরঃ ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার দোহাই দিয়ে দেশে সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার চাবিকাঠি কি তবে সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে? কেন্দ্রের তৈরি বিতর্কিত নতুন তথ্য সুরক্ষা আইনের বেশ কিছু ধারা নিয়ে এবার চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশের শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হলো দেশের ২১টি প্রথম সারির সংবাদপ্রতিষ্ঠান। ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে দায়ের করা এই মামলায় সামিল হয়েছে মুকেশ আম্বানির নেটওয়ার্ক-১৮, গৌতম আদানির এনডিটিভি, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং টাইমস ইন্টারনেট এর মতো শীর্ষ মিডিয়া হাউসগুলো।
শীর্ষ আদালতে জমা পড়া ৬৯৮ পৃষ্ঠার বিশদ আবেদনপত্রে স্পষ্ট অভিযোগ তোলা হয়েছে ২০২৭ সালের মে মাস থেকে কার্যকর হতে চলা এই আইনের বিতর্কিত বিধানগুলো বলবৎ হলে দেশে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে। একই সাথে সাংবাদিকদের গোপন তথ্যসূত্র ফাঁস হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হবে। আবেদনকারীদের অভিযোগ, গত আগস্ট মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ স্তরের সাথে সংবাদমাধ্যম প্রতিনিধিদের
এক বৈঠকে স্পষ্ট আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে, নতুন আইনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রাখা হবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন বা সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশগুলোর তথ্য সুরক্ষা আইনে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থের খাতিরে সাংবাদিকদের জন্য সুস্পষ্ট লিখিত ছাড় রাখা হলেও, ভারতের আইনে সাংবাদিকদের জন্য কোনো বিশেষ সুরক্ষার ব্যবস্থাই রাখা হয়নি।

অভিযোগ উঠেছে, এই আইনের ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক ঘটনার বিবরণ বা প্রেস রিলিজ ছাপানোর কাজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। ক্ষমতাশালীদের দুর্নীতি বা অনিয়ম নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। আইনের সবচেয়ে অদ্ভুত ও বিতর্কিত শর্তটি হলো, কারো ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশ করার আগে তার কাছ থেকে আগাম সম্মতি নিতে হবে। ডিএনপিএ-র যুক্তি, কোনো ই-কমার্স সংস্থা বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ তাদের গ্রাহকের তথ্য নেওয়ার আগে সম্মতি নিতেই পারে, তা যৌক্তিক।
কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রয়োগ করা চরম হাস্যকর ও আত্মঘাতী। কোনো মন্ত্রী, আমলা বা কর্পোরেট কর্তার আর্থিক কেলেঙ্কারি বা অনিয়মের তদন্ত করতে গিয়ে সাংবাদিক যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছেই আগাম সম্মতি চাইতে যান, তবে সেই ব্যক্তি সাথে সাথে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ লোপাট করে দেবেন এবং সম্ভাব্য সাক্ষীদের হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেবেন। ফলে জনস্বার্থে সত্য উন্মোচন করা কোনোদিনই সম্ভব হবে না।
আইনের অপর একটি মারাত্মক বিধান হলো, যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো সময় তার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের সম্মতি প্রত্যাহার করে তা সিস্টেম থেকে মুছে ফেলার দাবি জানাতে পারেন। সংবাদমাধ্যমগুলোর চরম আশঙ্কা, এই বিধানকে ঢাল বানিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, আর্থিক অপরাধী বা ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা জনস্বার্থে প্রকাশিত পুরোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, স্ক্যামের খবর বা আদালত সংক্রান্ত নথি অনলাইন পোর্টাল থেকে মুছে ফেলার জন্য সংবাদমাধ্যমের ওপর আইনি চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে প্রকাশিত তথ্যভিত্তিক ও সত্য প্রতিবেদনও মুছে ফেলতে হতে পারে, যা প্রকারান্তরে ইতিহাস বিকৃতি ও সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার সামিল।
নতুন আইনে গঠিত হতে যাওয়া কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ এর হাতে অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা তুলে দেওয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। এই কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থ এর অজুহাতে তথ্যের ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে এবং আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে সংবাদমাধ্যমের ওপর মোটা অঙ্কের আর্থিক জরিমানা চাপাতে পারবে। সচেতন নাগরিক ও বুদ্ধিজীবী মহলের মতে, সরকারি ব্যবস্থার অসংগতি বা শাসকদলের কোনো কেলেঙ্কারি ফাঁস করলে সংবাদমাধ্যমগুলোকে আর্থিক জরিমানার ভয়ে কাবু করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার পথ প্রশস্ত করা হয়েছে এই আইনের মাধ্যমে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল ভিত্তিই হলো গোপন তথ্যসূত্র । নতুন আইন অনুযায়ী, ২০২৭ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সরকার যেকোনো সংস্থার কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য তলব করার আইনি অধিকার পাবে।
সংবাদ মাধ্যমগুলোর আশঙ্কা, সরকারের নির্দেশে সংবাদপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের তথ্য ভাণ্ডার উন্মুক্ত করতে হলে, কর্পোরেট অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্নীতি বা নির্বাচনী জালিয়াতি ফাঁস করা হুইসেল-ব্লোয়ারদের পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যাবে। এতে গোপন তথ্যদাতাদের জীবনের ঝুঁকি ও পেশাগত নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, যার ফলে ভবিষ্যতে কেউ দুর্নীতির খবর সাংবাদিকদের দিতে সাহস পাবেন না।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিঃসন্দেহে মৌলিক, কিন্তু তার অজুহাতে বিচারবিভাগের চতুর্থ স্তম্ভ, সংবাদমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে দেওয়ার এই আইনি প্রয়াসকে গণতন্ত্রের জন্য চরম বিপজ্জনক বলে মনে করছে দেশের সচেতন মহল। ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখা হবে, কিংবা সুপ্রিম কোর্ট এই আইনের বিতর্কিত ধারাগুলোর ওপর কোনো স্থগিতাদেশ বা সংশোধনের নির্দেশ দেয় কি না, মঙ্গলবার শীর্ষ আদালতে এই হাই-প্রোফাইল মামলার শুনানির দিকেই এখন অপলক নজর সমগ্র দেশবাসীর।





